এক বছরে ৪৩ হাজার কোটি টাকা মূল্য হারিয়েছে পুঁজিবাজারের শীর্ষ ১০ কোম্পানি

প্রকাশিত: ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২০

দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের পতন শুরু হয় গত বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকেই। এ প্রবণতা এখনো অব্যাহত আছে।  সূচকের ধারাবাহিক পতনের কারণে এক বছরে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন কমেছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ কোম্পানিরই কমেছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

পুঁজিবাজারের নিম্নমুখিতার প্রভাবে বাজার মূলধন কমে গেলেও ব্যবসা কিংবা মুনাফা প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স বেশ আকর্ষণীয়। যদিও ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সের প্রতিফলন হয়নি শেয়ারের মূল্যমানে।

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩২২টি কোম্পানির মধ্যে বাজার মূলধনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের ৪ জুলাই কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজার মূলধন ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।  আর চলতি বছরের ৫ জুলাই শীর্ষ ১০ কোম্পানির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে কোম্পানিগুলো মূল্য হারিয়েছে ৪৩ হাজার ৭ কোটি টাকা।

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর আগে চলতি বছরের ৫ মার্চ শীর্ষ ১০ কোম্পানির বাজার মূলধন ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এর ঠিক চার মাস পর ৫ জুলাই শীর্ষ ১০ কোম্পানির বাজার মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর শীর্ষ কোম্পানিগুলো মূল্য হারিয়েছে ৯ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাজার মূলধনে সবার ওপরে রয়েছে টেলিকম খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেড। গত এক বছরে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ১৩ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।  আর করোনাকালে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৩ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। বকেয়া রাজস্ব নিয়ে সরকারের সঙ্গে গ্রামীণফোনের দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে এর শেয়ারদরে। তবে ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স বিবেচনায় কোম্পানিটির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তামাক খাতের বহুজাতিক জায়ান্ট ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিএটিবিসি) গত এক বছরে ৭ হাজার ৫৩২ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছে। আর করোনার সময়ে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।  তবে এ সময়ে কোম্পানিটি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এমনকি চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির ব্যবসা ও মুনাফায় রেকর্ড পরিমাণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

বিএটিবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেহজাদ মুনিম বণিক বার্তাকে বলেন, কোম্পানির শেয়ারদরে ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্সের প্রতিফলন ম্যাচিউরড মার্কেটগুলোতে দেখা যায়। আমাদের পুঁজিবাজারে সেভাবে এর প্রভাব দেখা যায় না।  বছর শেষে কোন কোম্পানি কত লভ্যাংশ দিল সেটিই বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের এখানে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার প্রবণতা কম। আর এ ধরনের তথ্যের অপ্রতুলতাও রয়েছে। পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানোর জন্য ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তিও বাড়াতে হবে।

দেশের ওষুধ খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বাজার মূলধন গত এক বছরে ৫ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা কমেছে। আর করোনার সময়ে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৯৯০ কোটি টাকা।  তবে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির ব্যবসা ও মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

জানতে চাইলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের হিসাব ও অর্থ বিভাগের প্রধান মো. কবীর রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, যেখানে কোম্পানির ব্যবসা ও মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেখানে শেয়ারদর কমার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের (জুলাই-মার্চ) কথাই যদি ধরি এ সময়ে আমাদের ব্যবসা বেড়েছে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, আর মুনাফা বেড়েছে ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তাছাড়া গত বছর আমরা বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।  আর করোনার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে টেলিযোগাযোগ ও ওষুধ খাতে সেভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এগুলোর প্রতিফলন শেয়ারদরে দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে ব্যাংকের সুদের হার কমে যাওয়ার কারণে তুলনামূলক বেশি রিটার্নের জন্য বিনিয়োগকারীদের শীর্ষস্থানীয় ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা উচিত বলে মনে করছেন তিনি।

দেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ইউপিজিডিসিএল)। গত এক বছরে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৬ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা। আর করোনার সময় কমেছে ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে মুনাফা বাড়লেও চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ইউপিজিডিসিএলের মুনাফা কমেছে।

ওষুধ খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি রেনাটা লিমিটেড গত এক বছরে ৫১১ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছে। আর করোনার সময়ে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৫০০ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ লিমিটেড (আইসিবি)।  পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত এক বছরে এ প্রতিষ্ঠানটির বাজার মূলধন কমেছে ২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আর করোনাকালীন বাজার মূলধন কমেছে ৮৪০ কোটি টাকা। চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে লোকসান হয়েছে আইসিবির।

আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, বাজার মূলধনে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর সবারই ব্যবসায়িক ও আর্থিক স্থিতি ভালো অবস্থানে রয়েছে। তারা ভালো লভ্যাংশ দিচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা হচ্ছে সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি।  আরেকটি বিষয় হলো আমাদের পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর তুলনায় ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য বেশি। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে তখন ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও এগিয়ে আসবেন। আর পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য আইসিবি বিভিন্নভাবে তহবিল জোগাড় করে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। অনেক সময় পুঁজিবাজারের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা করার বিষয়ে ছাড় দিতে হচ্ছে। সূচকের পতনের কারণে আইসিবির আনরিয়েলাইজড লসের পরিমাণও বাড়ছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আইসিবির শেয়ারে।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ব্র্যাক। গত এক বছরে ব্যাংকটির বাজার মূলধন কমেছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। আর করোনার সময়ে ব্যাংকটির বাজার মূলধন কমেছে ৫২০ কোটি টাকা।  ২০১৯ হিসাব বছরের পাশাপাশি চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা কমেছে।

দেশের রঙের বাজারের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড গত এক বছরে ৫৩৪ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছে। আর করোনার সময়ে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৪২০ কোটি টাকা।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) প্রেসিডেন্ট ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, সার্বিকভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির কারণেই পুঁজিবাজারের সূচক কমার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমেছে। বাজার মূলধনে শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সবারই ব্যবসা ও মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে।  কিন্তু তা সত্ত্বেও সার্বিকভাবে পুঁজিবাজরের নিম্নমুখিতার কারণে এদের শেয়ারদর কমেছে। আবার যখন সূচক ঊর্ধ্বমুখী হবে তখন কোম্পানিগুলোর দরেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে বাজারের দর পতনের তুলনায় বার্জারের দরপতন তুলনামূলক কম হয়েছে। পুঁজিবাজারে যাতে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ে সেজন্য প্রতি বছরই বহুজাতিকসহ ভালো কোম্পানিগুলোকে নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিগত ধারাবাহিকতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।

এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশের বাজার মূলধন গত এক বছরে ২০২ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে করোনার সময়ে কোম্পানিটি ১৭০ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় বিস্কুট উৎপাদনকারী কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বাজার মূলধন গত এক বছরে ২ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা কমেছে। আর করোনার সময়ে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৩৩০ কোটি টাকা।  উল্লেখযোগ্য হারে বাজার মূলধন কমার কারণে চলতি বছর অলিম্পিকের শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকা থেকে অবনমন হয়েছে। এর জায়গায় লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড শীর্ষ দশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন কমার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে রফতানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমেছে। এর প্রভাবে অর্থনীতিতে কিছুটা শ্লথগতি দেখা গেছে। যার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও।  বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির কারণে বাজার মূলধনে শীর্ষ অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাছাড়া এ বছরের জানুয়ারি থেকে ঋণ ও আমানতের সুদহার নয়-ছয় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে এসএমই খাতকেও নয়-ছয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। এ কারণে তখন ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে এর প্রভাব পড়তে দেখা যায়। সার্বিকভাবে এসব কারণেই শীর্ষ কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন কমেছে।

সুত্র ঃ বনিক বার্তা