করোনা সংকটে স্কুলের বেতন-ফি’র চাপে দিশেহারা অভিভাবক

প্রকাশিত: ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০

করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণের কারণে অনেকটাই থমকে গেছে জনজীবন। কর্মহীন হয়ে পড়েছে অনেকে। বিভিন্ন অফিসে কর্তন করা হচ্ছে বেতন। সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এরকম পরিস্থিতিতে সন্তানের স্কুলের বেতন ও ফি দেয়ার সামর্থ নেই অনেক অভিভাবকের।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্কুল কর্তৃপক্ষের ক্রমাগত চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। কিছু স্কুল এরকম পরিস্থিতিতেও বাড়িয়েছে বেতন ও ফি।

অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষকে ফি কমাতে অনুরোধ কিংবা আবেদনও করা হচ্ছে। তবে কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সম্পূর্ণ বেতন-ফি মওকুফ কিংবা হ্রাস করেছে স্কুল ফি।

রাজধানীর রূপনগরের মনিপুর স্কুল ও কলেজের মো. মিজানুর রহমান নামে ৯ম শেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, গত ১ মাসে তিনি কয়েকবার স্কুল কর্তৃপক্ষের এসএমএস (ক্ষুদে বার্তা) পেয়েছেন যে-  করোনাকালীন বকেয়া বেতন-ফি দেয়ার জন্য। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে অনেক স্কুলের মতো বেতন ও বিভিন্ন ফি বাড়ানো হয়েছে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ৮ম শ্রেণি থেকে ৯ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণদের কাছে ভর্তিফিসহ অন্যান্য বিষয়ে ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এদিকে আয় বাড়েনি বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে মিরপুর কলেজের এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় ভার্চুয়াল (অনলাইন) মাধ্যমে তার ৮ম শ্রেণির ছেলে সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে কোচিংয়ে পড়ে। কোচিংয়ের টাকা যোগাতেই হিমশিম খাচ্ছি। তারপর স্কুলের বেতন-ফি দিতে হবে। অথচ স্কুল বন্ধ রয়েছে। ক্লাস না করিয়ে এ বর্ধিত বেতন-ফি তারা নীতিগতভাবে চাইতে পারেন না। অভিভাবকদের জন্য ‘এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা’।

অপরদিকে, ৩০ জুনের মধ্যে ২ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য অভিভাবকদের কাছে এসএমএস পাঠিয়েছে ভিকারুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীর বাবা জানান, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত এপ্রিল মাস থেকে অফিসে তার বেতন অর্ধেক করে দিয়েছে। এ অবস্থায় মেয়ের স্কুলে দুই মাসের বেতন পরিশোধ করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

একই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীর বাবা রাশেদ মিয়া জানান, তার মেয়ের স্কুলের বকেয়া বেতন তিন হাজার ৭০০ টাকা পরিশোধের জন্য তাকেও এসএমএস করা হয়েছে। তার আরো দুই সন্তান অন্য স্কুলে পড়াশোনা করছে। ওই স্কুলগুলো থেকেও একই মেসেজ আসছে।

রাশেদ মিয়া জানান, তিনি একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করেন। গত তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। কিভাবে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করবেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। এরপর সন্তানের স্কুলের বেতন দেয়ার চাপে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে।

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জাহিন আক্তারের বাবা নাসির উদ্দিন জানান, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত তিন মাসের বেতন পরিশোধের জন্য স্কুল থেকে মেসেজ দিয়েছে। বেতন না দেয়া হলে ভর্তি বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছে। ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, করোনার কারণে তার ব্যবস্যা গত কয়েক মাস ধরে বন্ধ। চরম আর্থিক সংকটে আছেন তিনি।

এদিকে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের অভিভাবকরা পড়েছেন আরো বিপাকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর সেশন শুরু হয় জুন মাস থেকে। এর আগেই নতুনভাবে ভর্তির জন্য দিতে হয় মোটা অংকের স্কুল ফি। কিন্তু বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেক অভিভাবকের পক্ষে মোটা অংকের এই ফি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারছেন না তারা। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার স্কুল ফি মওকুফ কিংবা কমানোর জন্য অনুরোধ করা হলেও তারা তা মানছেন না।

অভিভাবকদের মতে, করোনার সময়ে এমনিতেই গত কয়েকমাস ধরে স্কুল বন্ধ ছিল। কবে স্কুল খুলবে তারও কোনো নির্দিষ্ট সময় কেউ বলতে পারছে না। আবার স্কুল খুললেও অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের করোনা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত স্কুলে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই সব স্কুলই অনলাইনে ক্লাস নেয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

অভিভাবকদের মতে গত ৩/৪ মাস ধরে স্কুল বন্ধ থাকার পরও তারা নিযমিত স্কুলের বেতন পরিশোধ করেছেন। কোনো ধরনের পরীক্ষাও হয়নি। স্কুল বন্ধ থাকায় সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্কুলে ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, পানি) ও ব্যবস্থাপনাসহ অনেক ব্যয় কমে গেছে। কিন্তু তারপরও তারা নতুন ক্লাসে ভর্তির জন্য পুরোপুরি সেশন ফি দাবি করছে। যা একেবারেই অযৌক্তিক। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, বন্ধ রয়েছে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। এখন অনেক অভিভাবকের জন্যই বাড়তি এই স্কুল ফি বহন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ফি না কমালে অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারবেন না। ফলে শিক্ষা জীবন থেকে ঝড়ে পড়বে একটি বছর।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর গোলাপবাগে গলগাথা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল (জেমস) নতুন শিক্ষাবছরে শিক্ষার্থীদের বেতন ও স্কুল ফি বৃদ্ধি করেছে। ব্যাপ্টিস চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন স্কুলটির সঙ্গে বৈদেশিক অনেক দাতা গোষ্ঠির সম্পৃক্ততা আছে। স্কুলটির শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের সেশন ফির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দেয়ায় ভর্তি হতে পারছে না অনেক শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সেশন ফি মওকুফ/হ্রাসের জন্য লিখিত আবেদন করেন কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু আবেদনে সাড়া দেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে স্কুলটির প্রিন্সিপাল জিসু কুমার দাস বলেন, ফি কমানো বা মওকুফের কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। এটি সম্পূর্ণ স্কুল কমিটির এখতিয়ার। তিনি অভিভাবকদের আবেদনটি কমিটির কাছে পেশ করবেন বলে জানান।

তবে নাম প্রকামে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের আবেদনের বিষয়ে কিছুই জানায়নি। এদিকে তারা অনলাইনে নতুন সেশনের ক্লাস শুরু করে দিয়েছেন। তারা আরো অভিযোগ করেন- স্কুলটিতে মানসম্মত শিক্ষকের যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে। তারপরও তারা বেতন বৃদ্ধি করেছে, কমায়নি কোনো সেশন ফিও।

রাজধানীর স্বনামখ্যাত স্কলাসটিকা স্কুলের অভিভাবকরাও সেশন ফি অর্ধেক কমানোর জন্য অনুরোধ করছেন কর্তৃৃপক্ষকে। তবে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের সেশন ফি অর্ধেক করা হয়েছে বলে জানা যায়।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সমস্যা না থাকলেও ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত হচ্ছে না। অনেকের বেতন অর্ধেক করা হয়েছে। আবার অনেক স্কুলে ছাটাইও করা হচ্ছে শিক্ষকদের।