Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / সর্বশেষ / উদভ্রান্ত: রাশেদুল কবির আজাদ (৩য় পর্ব)

উদভ্রান্ত: রাশেদুল কবির আজাদ (৩য় পর্ব)

  • ০৬-০৫-২০১৬
  • তিন.

    প্রতিদিনকার মতো সাহস যথারীতি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে তার ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ির সামনে খালের ওপর নির্মিত বহুদিন আগের ব্রিজের ওপর গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মেয়েটিকে কোলে নিয়ে সে চলে আসে ব্রিজের ওপর। চারদিকে ফুটফুটে জোছনা। তার চেয়ে বেশি জোছনা ফুটেছে তার কোলে। শিশুটি সারাদিন অপেক্ষায় থাকে কখন তার বাবা বাড়িতে আসবে। সাহসের কোলে বসে সে হাজারটা প্রশ্ন করে। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে সাহস ক্লান্ত হয়ে যায়। অবশেষে মেয়ের কপালে একটি চুমু খেয়ে বলে-

    -মা, আপনি কিছু খান না কেন?

    শিশুটির বয়স তিন বছর। তেমন কিছু বুঝে না। তাই সে যে উত্তর দেয়, তার সাথে সাহসের প্রশ্নের কোনো মিল থাকে না। এলোমেলো উত্তরগুলো সাহসকে আরো বেশি আনন্দ দেয়। এমন আনন্দময় মুহূর্তে সাহসের মনে পড়ে যায় তাঁর বাবার একটি কথা।

    সাহস যখন এইচএসসি পরীক্ষা ফেল করে পড়াশুনা না করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সময় তাঁর বাবা একদিন তাকে কাছে ডেকে বসায়। বাবা সব সময় তার সন্তানদের সাথে মাগরিবের নামাজের পরই কথা বলতেন।

    -শুনলাম তুমি পড়াশুনা না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছো?

    -হ্যা বাবা।

    -কেন?

    -সেটা আপনি ভাল করেই বুঝেন।

    -কারো জীবনে হঠাৎ করে অনাকাংঙ্খিত কিছু ঘটে যেতেই পারে। তোমার পরীক্ষা ফলাফলটা সেরকমই মনে করতে পারো। যে ছেলে এসএসসি ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করে সে ছেলের এইচএসসিতে এমন রেজাল্ট মেনে নেওয়া কষ্টকার। তাই বলে পড়াশুনা ছেড়ে দেয়া এটা কোনো ভাল কাজের নমুনা নয়।

    -এখন আমার পড়াশুনার খরচ কে চালাবে বলেন? আপনার বয়স হয়ে গেছে। জমিগুলো চাষাবাদহীন পড়ে আছে লোকের অভাবে। আপনার উপায় নেই আমাকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করার। আমি প্রতিনিয়ত কথা শুনতে পারবো না বাবা।

    -বউমার জায়গায় তোমার স্ত্রী হলেও সেও একই কাজ করতো।

    -সেটা আমি মানছি। তবে কথা শুনানো একটি পর্যায় থাকে!

    -সেটা অবশ্য বাস্তব। ইচ্ছে করলে তোমার বোনেরা তোমার পাশে এসে দাড়াতে পারতো কিন্তু তারা সে দায়িত্ব পালন করবে না। কারণ তারা এখন উচ্চশিক্ষিত। তুমি ফেল করেছো বলে তোমাকে তারা মোটেই ভাল দৃষ্টিতে দেখবে না। আমার সংসারে জগতের নিয়মটা ব্যতিক্রম। পরিকল্পনার অভাবে তোমাদের অনেকেই কাংঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। পরিবারের সবার মধ্যে আন্তরিকতা না থাকলে সে পরিবারে সার্বিক উন্নতি হয় না। যা হয় তা ব্যক্তি কেন্দ্রিক।

    আমি চিরদিন বেঁচে থাকবো না। আমার শরীরও ভাল না। তোমার মায়ের শরীরটাও ভাল না। তোমাকে শুধু একটি গল্প বলছি মন দিয়ে শুনো।

    তুমি আমার সবচেয়ে ছোট সন্তান। তোমার প্রতি আমার দায়িত্ব ছিল অনেক। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি। আমার কষ্ট তোমাকে বুঝতে হবে না। শুধু একটা কথা মনে রেখো, বাবা-মার প্রতি কখনও অভিমান রেখো না। তাতে আল্লাহর সাহায্য পাবে না।

    -তুমি আলেজেন্ডার দ্যা গ্রেট এর নাম শুনেছো?

    -হ্যা বাবা শুনেছি।

    -একদিন সে তার বাবার কাছে এসে বললো, বাবা আমি দেশের রাজা হবো। আলেকজেন্ডারের বাবা অল্প বয়সি তার সন্তানের কথা শুনে কিছুক্ষণের জন্য থমকে যান। তারপর তিনি সন্তানকে বলেন-

    -যাও ঘোড়াশালে (যেখানে ঘোড়া রাখা) গিয়ে দেখ একটি ঘোড়া পাগলামি করছে। তুমি যদি তাকে শান্ত করতে পারো তাহলে তুমি ঠিকই রাজা হবে।

    ছোট্ট আলেকজেন্ডার চলে গেল ঘোড়া রাখার ঘরে। কিছুক্ষণ পর সে ঘোড়াটি সাথে নিয়ে এসে তার বাবার সামনে হাজির হলো। আলেকজেন্ডারের বাবা ছেলের সাথে ঘোড়া দেখে অবাক !

    -এটা তুমি কিভাবে করলে!! রাজ্যের কোনো মানুষই পারেনি এই ঘোড়াটিকে শান্ত করতে অথচ তুমি তা করলে !!

    আলেকজেন্ডার হাসি মুখে উত্তর দিল-

    -বাবা আমি গিয়ে দেখি সূর্যটি ঘোড়ার পেছন কারণে ঘোড়াটির ছায়া গিয়ে পড়েছে তারই সামনের দেওয়ালে। ঘোড়াটি সেই ছায়াটিকে অন্য একটি ঘোড়া মনে করে অনবরত আঘাত করছে। আমি শুধু ঘোড়াটির মুখ আলোর দিকে মানে সূর্য্যরে ঘুরিয়ে দিয়েছি মাত্র। সাথে সাথে ঘোড়াটি শান্ত হয়ে যায়। সে তখন আর তার ছায়া দেখতে পায়নি। তাই তার পাগলামি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমি ওকে সহজেই আপনার কাছে নিয়ে আসতে পেরেছি।

    -আলেকজেন্ডার কত বছর বয়সে রাজা হয়েছিল জানো সাহস?

    -হ্যা বাবা।

    -গল্পটি মনে রেখো। জীবনে চলার পথে এমন অনেক ছায়া পিছু নেবে। কষ্ট, অবহেলা, ঘৃণা, বঞ্চিত করা, প্রতারণা, পরিহাস সব উদভ্রান্ত আঘাতগুলো তোমাকে ঘিরে ধরবে হয়ত। সেই সময় তুমি শুধু আলোর দিকে মুখটা রেখো তাহলেই আর কষ্ট পাবে না। জীবনে ওঠতে পারবে। জীবন মানেই সংগ্রাম, জীবন মানেই হেরে যাওয়া নয়। জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাই স্বাভাবিক। এগুলোর সম্মিলিত নামই জীবন।

    সাহস জীবনের প্রথম তার বাবার চোখ জল দেখতে পায়। হাতের রুমালটা দিয়ে তিনি সেই জল মুছতে মুছতে সাহসকে বলে-

    -আমার বড় ছেলে যেমন আমার কাছে মূল্যবান তেমনি আমার বড় বউমাও আমার কাছে মূল্যবান। সবচেয়ে বড় কথা আমার বড় বউমা একটি এতিম মেয়ে। কোনোদিন তার সাথে বেয়াদবি করবে না। সে আমাদের জন্য কি দায়িত্ব পালন করলো, কি করলো না, সেটা দেখার দায়িত্ব তোমাদের নয়। তুমি আমার শেষ সন্তান। তোমার জন্য আমার কি মায়া সেটা সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। তুমি এখন যেতে পারো।

    বাবার কথা শুনে সাহসের চোখেও জল চলে এলো। সে বাবার হাতটি ধরে বললো-

    -বাবা, আমি না বুঝে কোনো কথায় যদি আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।

    সাহসকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে তার মাথাটায় হাত দিয়ে আদর করতে লাগলো।

    (চলবে)

    ৬/৬/২০১৬

    (Visited 7 times, 1 visits today)

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *