Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / উপসম্পাদকীয় / ভেজাল ওষুধ তৈরির কেমিক্যালের গোপন কারবার এখন জমজমাট ।। songbadprotidinbd.com

ভেজাল ওষুধ তৈরির কেমিক্যালের গোপন কারবার এখন জমজমাট ।। songbadprotidinbd.com

  • ০৮-০৩-২০১৮
  • download (1)হাবিব রহমানঃ   নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরির মূল উপাদান কেমিক্যালের গোপন বাজার এখন অনেকটাই জমজমাট। এ কেমিক্যাল ছাড়া নকল ওষুধ উৎপাদন প্রায় অসম্ভব। কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে চলছে সব ধরনের ওষুধের কেমিক্যাল বিকিকিনি। এসব কেমিক্যাল যাচ্ছে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী সিন্ডিকেটের হাতে। ফলে সহজেই জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নকল কারবার চালিয়ে যেতে পারছে বিশাল চক্র। এ কেমিক্যালে উৎপাদিত হচ্ছে ক্যানসার প্রতিশেধক ও অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে প্যারাসিটামলের মতো জীবন রক্ষাকারী নকল ওষুধ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নকল ওষুধের কেমিক্যাল তৈরির গোপন বাজারের চাঞ্চল্যকর তথ্য।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধের কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধ করতে পারলেই নকল ওষুধের বাজার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে। কারণ এখান থেকে কেমিক্যাল কিনে অনেক অবৈধ কারখানা এমনকি ফ্ল্যাটবাসায় পর্যন্ত নকল ওষুধ উৎপাদন করতে পারছেন সহজেই।

    অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের একটি অংশ নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে কেমিক্যাল বিকিকিনি চক্রকে। তারা নিজেদের স্বার্থেই জিইয়ে রাখছেন এসব।আমাদের কাছে প্রাথমিক তথ্য আসে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল মার্কেটের অনেক ব্যবসায়ী অবৈধ ওষুধের কেমিক্যাল বিক্রি করেন। নিয়মিত পণ্যের আড়ালে কেমিক্যাল বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

    সরেজমিনে ওষুধের কেমিক্যাল বিকিকিনির অবৈধ চিত্র দেখতে যান প্রতিবেদক হাবিব রহমান। প্রথমেই যোগাযোগ হয় পুরান ঢাকার বড় কেমিক্যাল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত তুহিন কেমিক্যালের স্বত্বাধিকারী তুহিন হোসেনের সঙ্গে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান মিটফোর্ডের মমতাজ মার্কেটে। ওষুধের বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালের ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে। প্রতিবেদক পরিচয় দেন শাহ আলম ছদ্মনামে। এ নামেই প্রতিবেদককে চিনতে শুরু করলেন নকল কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু অপরিচিত হওয়ায় প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। শেষে কিছুটা কৌশলী হলেন প্রতিবেদক। তাকে জানানো হয়, আগেও তার কাছ থেকে কেমিক্যাল নিয়েছেন শাহ আলম। প্রতিবেদক নিজেকে দালাল পরিচয় দিয়ে কেমিক্যাল কিনতে চাইলেন। মানে তিনি নিজে নকল ওষুধ তৈরি করেন না। কেমিক্যাল ক্রয় করে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী চক্রের হাতে পৌঁছে দেন বিশ্বাস করেন তুহিন। তুহিনের কাছে সিপরো ২৫ কেজির এক ড্রাম, সিফিকজিম ২৫ কেজির এক ড্রাম ও এমোক্সাসিলিন ২৫ কেজি করে দুই ড্রামে ৫০ কেজির অর্ডার দেওয়া হয়।

    পরদিন সকালে টাকা পরিশোধ করে কেমিক্যাল নেওয়ার কথা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু পরদিন পণ্য না কিনে প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে নকল কেমিক্যাল বিক্রির বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে টালবাহানা শুরু করেন। তুহিন ভারত থেকে অবৈধপথে এসব কেমিক্যাল এনে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।অনুসন্ধানে উঠে আসে এমোক্সাসিলিন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম, ফ্লুক্লোনাজল, সিফিকজিম, সিপরো, রেনিটিডিন, মেট্রোর মতো ওষুধ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কেমিক্যাল গোপনে বিক্রি হচ্ছে।

    প্রতিকেজি সিফিকজিম ৬ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৮ হাজার, সিপরো আড়াই হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার, এমোক্সাসিলিন ২ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ২০০, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম এক হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা, রেনিটিডিন ৯০০ থেকে শুরু করে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

    তবে এই গোপন মার্কেটে কেমিক্যালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয় কয়েকগুণ পর্যন্ত।পুরান ঢাকার আরেক ওষুধের কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। মিটফোর্ডের মুনা কমপ্লেক্সের এই ব্যবসায়ী চোরাই কেমিক্যাল নিয়ে একবার ধরাও পড়েন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সিপরো ও সোডিয়াম ডাইক্লোফেনাক ২৫ কেজির দুই ড্রাম করে কিনতে চাইলে তিনি রাজি হন। পরে ডেলিভারি নেওয়ার সময়ও তাকে জানানো হয়। নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিবেদক পৌঁছে যান দোকানে। কিন্তু সাইফুলকে দূর থেকে ফলো করেই চলে আসেন প্রতিবেদক। প্রায় একই সময়ে সাইফুল ফের মোবাইল ফোনে কল দেন প্রতিবেদককে। কেমিক্যাল কখন ডেলিভারি নেবেন তা জানতে চান।

    বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমোক্সাসিলিন কেমিক্যাল দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুল, সিরাপ, চোখের ড্রপ ও ইনজেকশন উৎপাদন করা হয়। নাক, কান, গলাসহ বিভিন্ন প্রদাহ প্রতিরোধে এসব ওষুধ ব্যবহার হয়। সিফিকজিম দিয়ে এন্টিবায়োটিক ক্যাপসুল, সিরাপ ও ইনজেকশন উৎপাদন করা হয়। নিউমোনিয়া, টাইফয়েডের মতো রোগ নিরাময়ে এসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম দিয়ে ব্যথানাশক ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, জেল, চোখের ড্রপ ও ইনজেকশন উৎপাদন করা হয়। ফ্লুকোনাজল দিয়ে অ্যান্টি ফাংগাল ট্যাবলেট উৎপাদন করা হয়।

    মিটফোর্ডের মমতাজ মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী আবদুর রউফের সঙ্গে তৃতীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করেন প্রতিবেদক। তাকে এমোক্সাসিলিন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম, ফ্লুক্লোনাজল আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন এই তিন আইটেম ফুরিয়ে গেছে। কয়েকদিন পরে দিতে পারব।

    আমাদের অনুসন্ধান বলছে, পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার কাজী শাহজাহান বাবুল, মঞ্জুর মার্কেটের মহসিন কবির, শিহাব ট্রেডিংয়ের মালিক শাহীন আহমেদ ও রশিদ প্লাজার মৃণাল বাবু নকল ওষুধ তৈরির কেমিক্যালের অবৈধ ব্যবসা করেন।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন মাসুদ বলেন, ওষুধের রাসায়নিক বিক্রির তথ্য পেলে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে সমিতি।

    তবে আমরা নতুন কমিটি মাত্র এক সপ্তাহ আগে দায়িত্ব নিয়েছি। এখনো জানি না কারা এসব অবৈধ কাজ করেন।অনুসন্ধান বলছে, এসব কেমিক্যালের একটি বড় অংশ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ ছাড়া অস্তিত্বহীন ওষুধ কোম্পানির নামেও আসছে এসব কেমিক্যাল। যার পুরোটাই চলে যাচ্ছে মিটফোর্ড গোপন মার্কেটে।

    এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ওষুধ তৈরির মূল উপাদান দুটি। একটি এপিআই, অপরটি এক্সিপিয়েন্স। এপিআই হলো ওষুধের রাসায়নিক।

    এটি ছাড়া ওষুধ উৎপাদন সম্ভব নয়। জাতীয় ওষুধ নীতিমালা-২০১৬ অনুযায়ী খোলাবাজারে ওষুধের কেমিক্যাল বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু মিটফোর্ডের মার্কেটে যেভাবে বিক্রি হচ্ছে সেটিকে আমরা কালোবাজার বলব। মিটফোর্ডের যারা এটি করছেন, সেখানে অভিযান চালিয়ে সেসব দোকান বন্ধ করে দিতে হবে দ্রুত।তিনি বলেন, ওষুধের মাত্রা ঠিক না থাকলে অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল হলে তখন সেটি বিষে পরিণত হয়। বিষের সঙ্গে ওই ওষুধের কোনো তফাত নেই।

    ১৯৯৩ সালে রিড ফার্মা নামে একটি কোম্পানির প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে ২৮ শিশুর নির্মম মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়। ওই ঘটনার তদন্তে দেখা যায়, তৎকালীন অভিযুক্ত ওই ওষুধ কোম্পানি মিটফোর্ড থেকে ওষুধের কেমিক্যাল (এপিআই) ক্রয় করেছিলেন। কিন্তু কম দামিটা দিতে গিয়ে ভিন্ন কেমিক্যাল বিক্রি হয় ওই ওষুধ কোম্পানির কাছে। সেটির মান পরীক্ষা না করেই ওষুধ উৎপাদন করে কোম্পানিটি। সেই ওষুধ খেয়ে অকালে প্রাণ হারায় ওই ২৮ শিশু।ভেজাল ও নকল ওষুধবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, অবৈধভাবে ওষুধ উৎপাদনের মূলে রয়েছে কাঁচামাল। এটি নকল ওষুধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধ। কারণ এই কেমিক্যাল সহজলভ্য হওয়ার কারণেই ভেজাল-নকল ওষুধ উৎপাদন সহজ হচ্ছে।

    এই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান থাকবে।এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, আমরা নিয়মিত এসব কেমিক্যালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। সব সময় খোঁজ রাখা হয়, কোথায় কোথায় ওষুধের কেমিক্যালে বিক্রির চেষ্টা হচ্ছে।

    নকল- ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স।অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, শুধু অবৈধভাবে ওষুধ তৈরির কেমিক্যাল বিক্রি করেই ইতি টানেন না তারা। অধিক মুনাফার আশায় দামি কেমিক্যালের সঙ্গে কম দামি কেমিক্যাল মিশিয়ে বিক্রি করেন। ওষুধ কোম্পানিগুলোকে কেমিক্যাল আমদানির অনুমোদন নিতে হয় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে। একে ব্লকলিস্ট হিসেবে চেনেন সবাই। ওই তালিকা মেনে বিদেশ থেকে কেমিক্যাল আমদানি করে কোম্পানিগুলো।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি স্পষ্ট। পরিবীক্ষণের জায়গাও নেই। নকল ওষুধ তৈরির রাসায়নিক বিক্রির যে প্রসার ঘটতে যাচ্ছে, সেটি নিয়ন্ত্রণের দিকে যাওয়ার সুযোগ দেখা যাচ্ছে না। এটি বন্ধ করতে হলে এই খাত ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে সবার আগে। যারা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে। তিনি আরও বলেন, এখানে দুটি ঝুঁকি। একটি হলো গুণগত সেবাটা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ, অপরটি হলো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এটি স্বাস্থ্য খাতের বিষয় হওয়ায় সরকারের বাড়তি নজরদারি করা উচিত।

    দুর্নীতির দুরারোগ্য ব্যাধিতে আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র আক্রান্ত। এমন একটাখাত নেই যেটাতে দুর্নীতি নেই। এই দুর্নীতি যখন জীবন রক্ষাকারী ওষুধের খাতটিকে আক্রান্ত করে তখন শঙ্কা ও উদ্বেগের সীমা থাকে না। মানুষ ওষুধ খায় রোগ থেকে সুস্থ হবার জন্য। সেটাই যদি ভেজাল বা নকল হয় তখন সুস্থ হওয়ার বদলে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন রোগী। অসুস্থ হয়ে বাঁচার আশায় সাধারণ মানুষ যখন ওষুধের দ্বারস্থ হয়, তখন তাদের হাতে তুলে দেওয়া নকল–ভেজাল ওষুধ। নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরির মূল উপাদান কেমিক্যালের গোপন বাজার এখন অনেকটাই জমজমাট। এ কেমিক্যাল ছাড়া নকল ওষুধ উৎপাদন প্রায় অসম্ভব। কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে চলছে সব ধরনের ওষুধের কেমিক্যাল বিকিকিনি। এসব কেমিক্যাল যাচ্ছে নকল ওষুধ উৎপাদনকারী সিন্ডিকেটের হাতে। ফলে সহজেই জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নকল কারবার চালিয়ে যেতে পারছে বিশাল চক্র। এ কেমিক্যালে উৎপাদিত হচ্ছে ক্যানসার প্রতিশেধক ও অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে প্যারাসিটামলের মতো জীবন রক্ষাকারী নকল ওষুধ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নকল ওষুধের কেমিক্যাল তৈরির গোপন বাজারের চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানতে ক্লিক করুন http://songbadprotidinbd.com/?p=46562

    হাবিব রহমান/ স প্র বি / আ স/  ৭/০৩/২০১৮ 

    (Visited 73 times, 2 visits today)

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *