Templates by BIGtheme NET
Home / উপসম্পাদকীয় / দেশপ্রেমিকের খোঁজে ।। songbadprotidinbd.com

দেশপ্রেমিকের খোঁজে ।। songbadprotidinbd.com

  • ২৮-০১-২০১৮
  • DSC_8393 copyজি. কে. সাদিক: স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর শুধু আমি না আমার মতো অনেকই হয়তো একজন দেশপ্রেমিক নেতা, বৃদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীর সন্ধান করছেন। তাদের সাথে আমিও একজন দলভুক্ত বৈ কিছু না। কথাগুলো বলছি বিশেষ কারণে। এক চেতনাবাদী আরেক চেতনাবাদীর দিকে আঙ্গুল তুলছে। একদল অন্য দলকে দেশের শত্রু বলছে। ডানপন্থীরা বামদের বলছে অন্যদেশের আদর্শবাদী। বামরা পাল্টা খিস্তি দিচ্ছে ডানপন্থীদের সাম্প্রদায়িক বলে। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিত্য ঘটনা। মাঝে মধ্যে টেলিভিশনে টক-শো দেখে মনে হয় চায়ের দোকানের চাপাবাজী দেখছি। রাজনৈতিক নেতাদের জনসভা, আলোচনাসভা আর যত প্রকার সভা আছে সব সভার ‘মোরাল অব দ্যা স্টোরি’ হচ্ছে বিরোধী দলের উপর অপবাদ আর উসকানি মূলক বক্তব্য। অবস্থাদৃষ্টে সব সভাকে এককথায় প্রকাশ করলে যা পাওয়া যায় তাহলো ‘সহিংতাসভা’ বা ‘বিষোদগারসভা’। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা পরস্পরের প্রতি বিদ্ধেষমূলক যে বক্তব্য দেন এর মাধ্যমে তারা নিজেদের জন্য দুটি উপাধি ধার্য্য করেন। একপক্ষ যখন অন্যপক্ষকে চোর-বাটপার, মিথ্যুক, প্রতারক, সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী বলে বাদ-অপবাদের লম্বা ফিরিস্তি দেন। অবচেতন মনে এ উপাধিগুলো তারা নিজেদের জন্যও ধার্য্য করেন। কারণ একপক্ষ যখন অন্যপক্ষকে চোর-বাটপার, মিথুক-প্রতারক, সন্ত্রাসী, দেশদ্রোহী বলে অবহিত করেন তখন এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। যদি প্রতিপক্ষ উল্লেখিত ‘লকব’র উপযুক্ত না হন তাহলে যে বলছে সে মিথ্যুক। আর এমন বক্তব্য শুনে প্রতিপক্ষ বসে থাকার পাত্র নন। তারাও মাজার সমস্ত জোর লাগিয়ে গলাফাটিয়ে প্রতিপক্ষের সমোচিত জবাবে শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় আরও বাড়তি কিছু অপবাদ দিবে। যদি দু’পক্ষই সত্য হয় তাহলে আর বলার কিছু থাকে না, দু’দল একই গোদামের মালু। এখানে দুটি বিষয় তাহলো, যেকোন একপক্ষ সত্যবাদী আর একপক্ষ চোর-বাটপার। আর নয় তো একপক্ষ মিথ্যাবদী অন্যপক্ষ চোর-বাটপার। তাই প্রশ্ন জাগে চরিত্রবান স্বাচ্ছা দেশপ্রেমিক নেতা কই?

    একটা ‘কমন ডায়লগ’ আমাদের রাজনীতিতে ব্যবহার হয়, আর একটা সস্তা আবেগ। সেটা চেতনার কথিত আবেগের পশরা ছাড়া আমি আর বিশেষ কিছু মনে করতে পারি না। আমাদের সব চেয়ে বড় দূর্ভাগ্য হলো আমরা ‘বকধার্মিকদের’ কবলে পড়েছি। যবে না এদের কাছ থেকে রেহাই পাই তাবত এদেশের মানুষের মুক্তি ‘ঘুমের ঘরের স্বপ্ন’ জাগ্রত কর্ম নয়। রাজনীতির মাঠের কমন ডায়লগটা আমাদের সবার জানা। একদল রাজনৈতিক নেতা খুব দৃঢ়তার সাথে বলে উঠে তারাই স্বাচ্ছাদিলে দেশের সেবা করে, তারাই খাঁটি দেশপ্রেমিক। আর সব টাউড-বাটপার, দেশের স্বাধীনতা বিরোধী, সাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী আরও কত খিস্তি হয় তার বিবরণ দিতে গেলে লেখা শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় পূর্ণ হয়ে যাবে। যার রুচিশীল পাঠকের পাঠোপযুক্ত থাকবে না। তবে আবেগটার উৎসটা ‘সহিহ’ আর বাদবাকি যা হয় সবই ‘পেটনীতির’ জন্য ভণিতা। মুক্তিযুদ্ধের আসল চেতনা কোনটা সেটাই তো ৪৬ বছর পরও দ্বান্দ্বিক। এখন আমরা যেভাবে বলছি ‘স্বাধীনতার স্বপ্নের’ কথা সে বয়ান আর লেখা দেখে মনে হয় আমাদের পূর্বপুরুষদের ‘স্বপ্ন দোষ’ ছিলো। তারা রাত দিন ২৪ ঘন্টায় ‘স্বপ্ন’ দেখতো। তা না হলে এতো কি করে সম্ভব? এখন বড় একটা কর্ম হচ্ছে আগে ঠিক করা কোনটা আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিলো আর কোনটা নয়। তারপর বাস্তবায়নের জন্য মাঠে নামা। কিন্ত একজন বলে স্বপ্ন ছিলো এই আর অন্যজন ঠিক তার উল্টো। তর্ক-বির্তক দেখে হয়তো আগামী প্রজন্ম এটাই ধরে নিবে যে, আমাদের স্বাধীনতার মূল স্বপ্ন অত্যাচরী, স্বৈরাচারী, পেটুক, শোষক শ্রেণিভুক্ত শাসকের হাতে নির্যাতিত ও পৃষ্ঠ হয়ে বিলীন হয়ে গেছে। এখন আর স্বপ্ন বলে কিছু নাই। পাঠক কথাগুলো বাজে বকছি না; যারা ইতিহাস, সাহিত্য পড়েন তাদের কাছে একটা অনুসন্ধানের ‘আবদার’ রাখছি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আুেগ আমাদের দেশের কোন বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাহিত্যকদের এমন একটা কর্ম খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন যা দ্বারা তারা বুঝিয়েছেন বা দেশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎবাণী করেছেন। বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞানবহরের আওতায় আগামীকালের বাংলাদেশর রূপটাই ধরা পড়েনি, এখনও পড়ছে না।

    দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর আগে। কিন্তু অতি চেতনাবাদী ও অতীতধারী একদল এখনও কথায় কথায় ‘পাকিস্তান নিপাত যাক’ শ্লোগানে মাঠ-ঘাট কম্পিত করে তুলে। পাকিস্তান আর নিপাত কি যাবে? ৩০ লাখ মানুষ তো শহীদ হয়েছেই, ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম তো হারিয়েছেই। সেটা অতীত; সেটা আর ফেরানো যাবে না। কিন্তু তারা যে দেশের জন্য, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রাণ দিয়েছে সে দেশ আছে, আছে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সমস্ত উপকরণ। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার এরা পারেনি সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কোন সুপরিকল্পনা বা ‘মাস্টার প্ল্যান’ দিতে। অতীতের গর্ভে বর্তমানের জন্ম। অতীতধারী এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ‘মাড়ির দাঁত’ দিয়ে কামড়িয়ে আষ্টে-পৃষ্ঠে অতীতকে এখনও ধরে আছে। দেশ স্বাধীন হবার মাত্র ৪ বছরের মাথায় দেশ পথ হারালো। সেনাশাসন-স্বৈরশাসন শুরু হলো। কাক্সিক্ষত মুক্তি পেতে আবার প্রায় ১৫ বছর লেগে গেলো। আবার ক্রমে মাথায় জগদ্বল পাথরের মতো সহিসংতা ও অপশাসন চেপে বসলো। উত্থান-পতন আবার পুনঃগনতন্ত্র ফিরে পাওয়া এই সময়ে মধ্যে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা কি এমন কর্ম দেখাতে পারবে যা দ্বারা ‘স্বাধীনতার স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের পথে হাটা যাবে। যেদিকে বৃষ্টি সেদিকে ছাতা ধরাতেই সময় পাড়। ইতিহাস পাঠে জানতে পারি পাকিস্তান আমলে ‘প্রেস স্ট্রাট’ ছিলো স্বৈরশাসক আয়ুব খানের পকেট পোষা বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের জন্য। এরা এমন কোন কাজ করতো না যা দেশ ও জাতির কাজে লাগে। আজও তাই। আমি কোন শ্রেণির বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে চাই, ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা অনুধাবন করতে পেরেছি তাই বললাম। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী অপরপক্ষকে সাম্প্রদায়িক বলছে, তারা আমার পাল্টা বলছে ‘রাশিয়ার ছাতাবাহী’ আরেক শ্রেণি ‘পাকিস্তানপন্থি’। সবিনয়ে একখানা প্রশ্ন হলো দেশ-জাতিপন্থি কোন শ্রেণি?

    এটা সোভিয়েত রাশিয়া নয়। রাশিয়ার উন্নয়নের সূত্র আমদের দেশে একই কায়দায় প্রয়োগ করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভবনা জোরালো। পশ্চিমাদের সংস্কৃতি আর আমাদের সংস্কৃতি এক নয়। তাদের পারিবারিক কাঠামো, শিক্ষাপদ্ধতি, সংস্কৃতি তাদের সূত্রমতে আমাদের দেশে প্রয়োগ করা যাবে না। ‘আমিত্ব’ হারালে আমরা আবার পরাধীন হয়ে যাবো। মানচিত্র সর্বস্ব স্বাধীনতা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তুরস্ক বা মিশরের ইসলামপন্থি দলের সূত্র বাংলাদেশে প্রয়োগ করলে আমাদের অস্তিত্বহানী ঘটবে। আমাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি যা হাজার বছরের পুরোনো। তাই আমাদেরকে ভাবতে হবে এই দেশের সংস্কৃতি ও ভৌগলিক বিষয় নিয়ে আর জনগন কেমন চায় তাদের প্রত্যাশার আলোকে। কোন দলীয় ফরমূলায় দেশের উন্নয়ন নাও হতে পারে। কারণ সে দলের গ্রহণযোগ্যতা একটা বড় ‘ফ্যাক্ট’। যারা কমিউনিস্ট তারা কি দেশের সবার কাছে তাদের উন্নয়নপদ্ধতির গ্রহণ যোগ্যতা পাবে? ইসলামপন্থি দলগুলোও কি অনুরূপ সমর্থন আদায়ে বা তাদের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারবে? এদেশের মানুষ ধর্মকে জীবন থেকে বিচ্ছন্ন করবে না। আর ‘শাসনী নৈতিকতা’র চাইতে ধর্মীয় নৈতিকতা মানুষকে অপরাধ থেকে বিরত রাখতে বেশি কার্যকর। আবার ধর্মের নামে গোড়ামী আমাদের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে। অতএব, দুটা থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষার, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হবে জনমনের প্রত্যাশার আলোকে ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়। আর এখানেই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। তারা জনগণের সম্পত্তি হওয়ার চাইতে শাসক শ্রেণির আস্থাভাজন হতে ব্যতিব্যস্ত। কারণ জনগন ক্ষমতা, অর্থ দিতে পারে না। কিন্তু শাসকশ্রেণি ক্ষমতা, অর্থ আর বিশেষ করে ‘আর্টিফিসিয়াল’ ও একপক্ষীয় সম্মানের ‘ডিব্বা’ দিতে পারে।

    বড় বিপদজ্জনক মানবশ্রেণি হলো বুদ্ধিজীবীরা। এদের রূপচেনা কষ্টকর। আজ এক বিশ্বাস করছে তো কাল ঠিক উল্টো। স্বার্থের দলনে পড়ে নিজেকেও বিক্রি করে দিবে। আহমদ ছফার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইটা পাঠকে খুব করে পড়ার অবদার জানাচ্ছি। এরা স্বৈরাচারীকেও ক্ষমতায় রাখতে যেমন পর্দার আড়ালের ক্রীড়ানর, তেমনি পতনেও। তাই বুদ্ধিজীবীরা যখন বিবেক বিক্রি করে সে দেশ থেকে সুশাসন ‘বিদায়ী সালাম’ লয়। বিবেক যেমন একটা মানুষকে পরিচালিত করে, তেমনি বুদ্ধিজীবীরা একটি জাতিকে পরিচালিত করে। তাদের একটা বক্তব্য বা লেখনিই জাতির আমূল পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট। যে দেশের বুদ্ধিজীবীরা জনতারকণ্ঠ হয় সে দেশে জনগনের সরকার ও শাসন বৈ স্বৈরাচারী রাজত্ব করতে পারে না। বর্তমানে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশকেই স্বৈরশাসনের কথা বলতে শুনা যাচ্ছে। যদি তারা সত্যবাদী হয় তাহলে আমি এটা বলি যে, এর জন্য মূলত দ্বায়ী বুদ্ধিজীবীরাই। কারণ সর্বজন স্বীকৃত স্বৈরশাসক এরশাদের সময়ও একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী তার আজ্ঞাবহ ছিলো। তাদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ লালনের দেয়াল লিখন হতো ‘এরশাদের চরিত্র, ফুলের মত পবিত্র’।

    গত শতকের নব্বই এর দশকের পর থেকে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রায় সম্পূর্ণটাই জীবন বিচ্ছিন্ন। এরাও দলীয় আজ্ঞাবহ। কারণ এদের উদ্দেশ্য নিরেট দর্শক হাসানো। সম্প্রতি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অশ্লীলতাই হচ্ছে মূল উপাদান। এর বিচার পাঠকের দৃষ্টি, শ্রবণ ও বিবেকের উপর দিতে চাই। জাতীয় জীবনের সংকটের কোন একটা বিষয় আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিফলিত হচ্ছে বা এ নিয়ে তাদের কোন কর্ম আছে? বিচরের ভার পাঠকের উপর দিলাম।

    আমাদের বড় জোর হলো থুঁতনিতে। নিজের অপারগতার সমস্ত দ্বায়ভার অন্যের কাঁধে চাপিয়ে শান্তিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। প্রতিপক্ষের জন্য উন্নয়ন করতে না পারার কথাটা আমাদের উন্নয়নের রূপকারদের মুখের নিত্যবাণী। ‘আমাদের জাতীয় মূলধন হতাশা’ সেটাই আরও প্রকট হচ্ছে।
    জি. কে. সাদিক
    প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
    ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
    মোবাইল : ০১৯৩৮-৯৭৪৮৮৪

    (Visited 16 times, 1 visits today)

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *