Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / উপসম্পাদকীয় / নারীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চান? ।। songbadprotidinbd.com

নারীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে চান? ।। songbadprotidinbd.com

  • ২৭-১২-২০১৭
  • 25594404_10215137981908530_3500907075146438578_nলীনা পারভীনঃ  বর্তমান বাংলাদেশে প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে খারাপ খবরের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। তবে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে যে অংশটি তার নাম ‘নারী’। নারীর সামাজিক অস্তিত্ব মনে হচ্ছে যেন কোন একটি গোষ্ঠী মুছে দিতে বা অস্বীকার করতে চাইছে। নারী নির্যাতনের হার যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে হুমকী-ধামকী দিয়ে নারীর অগ্রগতিকে আটকে রাখার অপচেষ্টার সংখ্যা।

    একবিংশ শতকের এই আধুনিক যুগে এসে পৃথিবী যখন এগিয়ে যাচ্ছে নারী পুরুষের পরিচয়ে নয়, মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে মানুষের অবদানকে বিবেচনা করে ঠিক তখনি আমরা যেন হেঁটে চলেছি বিপরীত দিকে। নারীকে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ টিকে থাকতে হচ্ছে লড়াই করে। সংসার, ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটা জায়গায় এ লড়াইয়ের মাঝেই বেঁচে থাকতে শিখতে হচ্ছে। এ যেন মানুষের পৃথিবীতে এলিয়েনের বেঁচে থাকার লড়াই।

    এই যে বাংলাদেশ, তার জন্ম থেকে আজ অব্দি প্রতিটা উন্নয়ন, অগ্রগতিতে রয়েছে নারীদের অবদান। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিটা স্তরেই সাহসের সাথেই পুরুষের সাথে সমতালে অবদানে এগিয়ে এসেছে নারীরা। কিন্তু কোথায় যেন এই অবদানকে অস্বীকৃতির এক প্রতিযোগিতা জারি রয়েছে এখনও।

    এইতো কিছুদিন আগে সংবাদ হলো নারীকে কৃষি জমিতে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে স্থানীয় মোল্লারা। কারণ কী? কারণ নারীরা হচ্ছে অপবিত্র। তারা শস্যক্ষেত্রে প্রবেশ করলে ফসলের ক্ষতি হবে। অথচ ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে এই নারীদের হাত ধরেই এসেছে কৃষিকাজ। যখন থেকেই মানুষ নিজের খাদ্য উৎপাদনের ভাবনা ভাবতে শিখেছে, ফসল উৎপাদন করে নিজের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে শিখেছে তখন থেকে নারীরাই ছিলো প্রধান চরিত্রে। সে চিত্র কী এখনও নেই?

    আমাদের বাংলাদেশের গ্রাম গ্রামান্তরে এখনও নারীরাই বেশীরভাগ কাজ করে ফসলের মাঠে। নিজের হাতে জমি তৈরী করে, ফসলের চারা বুনে, ফসল কাটে, ধান মাড়াই করে, ধান শুকায়, চালের জন্য তৈরী করে। এসব কাজের জন্য প্রয়োজন প্রচণ্ড মাত্রার শারীরিক শক্তি। সেই তুলনায় নারীর পুষ্টির হিসাব কেউ রাখে না। ফসলের মাঠের অবদানকে কেউ স্বীকার করতে চায় না বরং সস্তা শ্রমের জন্যই জমির মালিকরা নারীকেই বেছে নেয় শ্রমিক হিসাবে।

    অথচ এইসব ভণ্ড মোল্লারা কোন রকম বিবেচনা ছাড়াই ঘোষণা দিলো নারী অপবিত্র। ফসলের মাঠে তাদের যেতে মানা। সেই মোল্লারা কী এত বছর ধরে যেসব নারীরা ফসলের মাঠে অবদান রেখে এসেছেন তাদের সেই শ্রমকেও অস্বীকার করতে চান? কোন পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে তারা সিদ্ধান্ত নিলো নারী ফসলের জন্য ক্ষতিকর? কিছুই না, এসব হচ্ছে নারীকে গৃহে বন্দী করার ধান্দা। সমাজে নারীর অবদানকে অস্বীকার করে নারীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করার ব্যবসা।

    নারীকে গৃহবন্দী করার প্রক্রিয়া চলছে গোটা দেশ জুড়ে। কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে নির্মানাধীন ভাস্কর্য থেকে নারীর মূর্তিকে বাদ দেয়ার দাবি করেছে একই অঞ্চলের মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ। উদ্বেগজনক হলেও সত্য যে নির্মাতারা সে দাবি অনুযায়ী নারীকে বাদ দিয়ে সেখানে আরেকটি পুরুষের কাঠামো ঢুকিয়ে দিয়েছে। ভাস্কর্যটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে।

    মাদ্রাসার লোকেরা চাইলেই কী মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ও উপস্থিতিকে মুছে দিতে পারবেন? না ইতিহাসকে অস্বীকার করতে পারবেন? তাহলে যে নারীটি রাইফেল হাতে ময়দানে যুদ্ধ করে পুরুষের পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতায় অবদান রেখেছে তার ইতিহাস জানাতে কেন এই অনীহা? এ কী কেবলি ইসলামের অজুহাত না অন্যকিছু?

    নারীকে অস্বীকৃতির নজর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রতিটা ক্ষেত্রেই। একজন নারীকে এই অস্বীকৃতির সংস্কৃতিকে ফয়সালা করেই চলতে হচ্ছে এই স্বাধীন ও আধুনিক বাংলাদেশে। সংসার জীবনেও পায় না তার অবদানের মর্যাদা।

    একজন স্বামী সারাদিন অফিসে কাজ করেন আর যে স্ত্রীটি তাকে কাজের দুনিয়ায় নির্বিঘ্নে কাটাবার মত মানসিক শান্তির নিশ্চয়তা দেয়, সংসারের হাজারো হিসাব থেকে মুক্তি দেয় দিনশেষে বাড়ী ফিরে সেই স্বামীই তার স্ত্রীকে ডায়ালগ দেয় সারাদিন করোটা কী? বসেইতো থাকো।

    ভাবখানা এমন যে বাড়ীর রান্নাবান্না, গৃহস্থালী কাজগুলো অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যায়। সন্তানের খাবার থেকে, স্কুলে আনা নেয়া, পড়তে বসানো, যৌথ পরিবার হলে পরিবারের অন্যান্যদের সুযোগ সুবিধার খেয়াল রাখা আর নিজের খাবারটাই সময়মত খেতে না পারার কাহিনীগুলো থেকে যায় অস্বীকৃত। কেউ শুনতে চায় না সেই কাহিনী। যুগ যুগ ধরে চলে আসা আমাদের বাঙালী নারীদের এই অব্যক্ত কান্নাকে অবহেলার চেষ্টা চলছে এখনও।

    একজন নারীকে ঘুম থেকে উঠতে হয় সবার আগে। উঠতে ইচ্ছে করুক আর না করুক তাকে উঠতেই হবে আর না হয় শুনতে হবে নানা রকম বাঁকা ডায়ালগ। অসুখে বিসুখেও কাজের জায়গাটতে অনুপস্থিতির কোন সুযোগ নাই। সেই একই নারী আবার প্রয়োজনে জ্বলে উঠতেও পিছ পা হয় না।

    এখনতো নারীরা দোকানদারী করা থেকে শুরু করে সংসদ পর্যন্ত চালাচ্ছে। তাহলে নারীদের এই অর্থনৈতিক অবদানকে অস্বীকার করে কী সভ্যতা আগাতে পারে? বাংলাদেশ কী পারবে আগাতে?

    সিলেটের একটি মাদ্রাসার সামনে নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য শৌচাগার নির্মান করা হচ্ছিলো। এটি একটি খুবই ভালো ও সামাজিক উদ্যোগ। কিন্তু বাধা এসেছে এখানেও। মাদ্রাসার সামনে কোন শৌচাগার নির্মাণ করতে দিবে না মাদ্রাসার ছাত্ররা। এতে তারা মনে করছে মাদ্রাসার ঐতিহ্য নষ্ট হবে। শৌচাগার কী অপবিত্র জায়গা? না নারীদের জন্য করা হচ্ছে বলে সেটি অপবিত্র হয়ে গেলো?

    এই যে মাদ্রাসার ছোট ছোট বাচ্চারা শিখছে নারী মানেই অপবিত্র ও অচ্ছুৎ তাহলে এদের স্ত্রী বা চারপাশের নারীদের সম্পর্কে কী ধারণা বা বিদ্বেষমূলক মনোবৃত্তি নিয়ে এরা বেড়ে উঠছে সেটা কী ভাবা যায়? এইসব ছেলেরাই সামনের দিনগুলোতে নারীদের জন্য পদে পদে ফতোয়া তৈরী করবে। আটকে দিতে চাইবে নারীদের অগ্রগতি।

    ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিরোধও গড়ে উঠছে কিন্তু ঘটনাগুলো কী আসলেই বিচ্ছিন্ন? বাস্তবতা হচ্ছে এসবের কোনটাই বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিটা ঘটনাই একটি মানসিকতাকেই প্রকাশ করছে আর সেটি হচ্ছে নারীদের ছোট করে দেখা বা চরম নারী বিদ্বেষ। নারীকে অবহেলিত মনে করা। সমাজে নারীর অবদানকে অস্বীকার করতে চাওয়া।

    এভাবে করে করেই নারীকে যেন আবার একদিন ঘরের চারদেয়ালে আটকে ফেলা যায় এসব তারই একটি মহড়া চলছে গোটা দেশ জুড়ে। হাইকোর্টের সামনের লেডি জাস্টিসিয়া নিয়ে কাহিনী আর সিলেট বা তাড়াইলের ঘটনা কোনটাই কোনটি থেকে আলাদা নয়।

    আর এসব যে আলাদা নয় তার প্রতিফলন হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতির হার কমে যাওয়া। নারীদের মাঝে আত্মনির্ভরশীল হবার মানসিকতাকে হত্যা করা। তাদের মাঝে বেড়ে উঠা আত্মমর্যাদার চিন্তাকে নষ্ট করে দেয়া।

    জানি না, এসবের ফলাফল কী হবে তবে এখুনি এসব কুপুমণ্ডুকতাকে রুখে দেয়া না গেলে হয়তো সেইদিন আবারও ফিরে আসতে পারে যখন বেগম রোকেয়াকে ঘরে ঘরে পায়ে হেঁটে অনুরোধ করে বের করে আনতে হয়েছিলো গৃহের কোণে আটকে থাকা নারীদের। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ঝরাতে হয়েছিলো নিজের কপালের রক্ত।

    লীনা পারভীন : কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা।

    (Visited 17 times, 1 visits today)

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *