Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / ফিচার / যে নারী হাজার মাইল পথ হেঁটেছেন একা একা

যে নারী হাজার মাইল পথ হেঁটেছেন একা একা

  • ০৮-০৩-২০১৬
  • 20FDFDএকজন নারীর পক্ষে কি একটানা তিন বছর ধরে হাঁটা সম্ভব? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কেন একজন নারী এটা করবেন? তিনি কেন একটানা এক হাজার দিন ধরে হাঁটবেন? তার উদ্দেশ্য কি? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য কথা?

    সারাহ মারকুইস ঠিকই এরকম একটা অবিশ্বাস্য হন্টন দিয়েছেন। এই সুদীর্ঘ ভ্রমণে তার পায়ে ৮ জোড়া জুতার তলি ক্ষয়ে গেছে। তিনি অতিক্রম করেছেন ২টি মহাদেশ এবং ৬টি দেশ। কাজটা করতে তার সময় লেগেছে ৩ বছর। এ সময়ে তিনি পান করেছেন ৩ হাজার কাপ চা। কিন্তু শেষপর্যন্ত যাত্রা শেষ করেছেন। একজন নারী হয়েও একা একা হেঁটে তিনি পাড়ি দিয়েছে ১০ হাজার মাইল।

    সারাহ বলেন, ‘এটা ছিল আমার শৈশবের একটা স্বপ্ন। ভেতর থেকে কেউ একজন আমাকে সবসময় একটা তাগাদা দিত। আমি প্রকৃতিকে বুঝতে চাইতাম, বুঝতে চাইতাম আমার ভেতরের আমিকে।’

    সারাহ মারকুইসের বয়স এখন ৪৩ বছর। তিনি সুইজারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের জুরা পর্বতমালার একটি ক্ষুদ্র গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সুইস পল্লী অঞ্চলের প্রকৃতি, গাছপালা এবং পাখিরাই ছিল সারাহর সঙ্গী। এরাই আসলে তাকে কৌতূহলী করে তুলেছিল বাকি পৃথিবীর প্রতি। কেমন দেখতে পৃথিবীর অচেনা সব পাহাড়-মরু-সাগর?

    ৮ বছর বয়সে সারাহ একবার তার পোষা কুকুরকে নিয়ে ঘর পালিয়েছিলেন। সারা রাত কাটিয়েছিলেন একটি গুহার মধ্যে। রোমাঞ্চের প্রতি তার টান রয়েছে খুব ছোটবেলা থেকেই। যতই বড় হয়েছেন তার রোমাঞ্চের নেশা আরও বেড়েছে, তিনি গিয়েছেন দূর দূরান্তে।

    পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি ঘুরছেন নিউজিল্যান্ডে, অতিক্রম করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, ১৪ হাজার কিমি হেঁটে অস্ট্রেলিয়ার জনমানুষহীন প্রান্তর অতিক্রম করে পৌঁছেছেন দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতে। কিন্তু ২০১০ সালে চূড়ান্ত একটি দুঃসাহসিক ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

    ৩ বছর মেয়াদি এই ভ্রমণের সূচনা হয়েছিল সাইবেরিয়া থেকে। সেখান থেকে তিনি গোবি মরুভূমি পাঁড় হয়ে, চীন, লাওস এবং থাইল্যান্ডে পৌঁছলেন। থাইল্যান্ড থেকে উঠে বসলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনগামী একটি মালবাহী নৌকায়। ব্রিসবেনে পৌঁছে পাড়ি দিলেন সম্পূর্ণ অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ। তার এই আশ্চর্য ভ্রমণে সমাপ্তি হয়েছিল মরুভূমির একটি গাছ তলায়। এই গাছ তলাটি সারাহর কাছে ছিল বিশেষ একটি জায়গা। তিনি এই জায়গাটা প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন এক যুগ আগে।

    সারাহ ৭ বছর বয়স থেকেই শিকারে দক্ষতা অর্জন শুরু করেছিলেন। ভ্রমণ চলাকালে তিনি চেষ্টা করেছেন জনমানুষ এবং লোকালয় এড়িয়ে শিকার করে জীবন ধারণ করার জন্য। যাত্রাপথে কাজটা মোটেও সহজ নয়। কিন্তু এটা কতটা কঠিন সেটা ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা।

    তিনি বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম মানব সভ্যতার একেবারে গোঁড়ায় ফিরে যেতে। ৬০ হাজার বছর আগে আদিবাসীরা এই ভাবে বাস করতো। কিন্তু এভাবে খাবার খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। পৃথিবীতে খাবারের জন্য মানুষের যে সংগ্রাম সেটা আসলে আদিম সংগ্রাম। এই সময়েই আমি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।’

    যাত্রাপথে শুধু খাওয়ার সমস্যাই না, সারাহকে পোহাতে হয়েছে আরও অনেক সমস্যা। মন এবং শরীর সুস্থ রাখার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করতে হয়েছে তাকে। তিনি আমি বলেন, ‘আমি আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে যে রকম স্থির ছিলাম, তেমনি গোটা জিনিসটা ভাগ ভাগ করে এক ধাপ একধাপ করে এগিয়েছি। আমাকে সদা সচেতন থাকতে হয়েছে।’

    তবে এটা তিনি করেছেন বেশ কয়েকবার বিপদে পড়ার পর। বেঁচে থাকার জন্য আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি তখন গোবি মরুভূমিতে ক্যাম্প করে ছিলাম। ভোর ৫ টার দিকে আমার তাবুর চারপাশ ঘিরে ধরলো ৫টা নেকড়ে।’ তবে সহজে ভয় পাওয়ার মত নারী সারাহ নন। নেকড়ের উপস্থিতি তাকে পৃথিবীতে নিজের উপস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন করে দিয়েছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পৃথিবীতে মানুষ ছাড়াও আরও অনেক প্রাণী রয়েছে। প্রকৃতিতে মানুষই সব না।
    সারাহর বিশ্বস্ত সঙ্গী কুকুর

    একজন নারী হয়ে এই ভয়ানক ভ্রমণ তার জন্য সহজ ছিল না। অনেক জায়গাতেই প্রচণ্ড শারীরিক ধকল গেছে তার উপর দিয়ে। লাওস জঙ্গলে বন্দুক ধারী মাদক ব্যবসায়িরা আক্রমণ করে তাকে। এটা শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়ার মতোই ভয়াবহ ব্যাপার। তিনি বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে আমি গর্বিত। কিন্তু যাত্রা পথে মাঝে মাঝে এও ভেবেছি যে, আমার যদি পুরুষের পেশী শক্তি এবং লোমশতা থাকতো তাহলে ভালো হত।’

    সারাহ তার সফলতার পেছনে লিঙ্গকে ব্যবহার করতে চান না। কিন্তু লিঙ্গের কারণে তাকে যে সমস্ত সমস্যায় পড়তে হয় সেটা এড়ানোর উপায় নেই। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু দেশ অতিক্রম করার সময় আমাকে পুরুষের ছদ্মবেশ নিয়ে থাকতে হয়েছে। কারণ সেখানে নারীদের অধিকার নেই। যেমন, চীনের কিছু কিছু অঞ্চলে একলা নারীকে বিবেচনা করা হয় যৌনকর্মী হিসেবে।’

    সারাহ বলেন, ‘নারীদের মধ্যে রোমাঞ্চকর অভিযাত্রার একটা ঘাটতি দেখা যায়। কিন্তু আমি যে এটা করেছি সেজন্য গর্বিত। পৃথিবীতে আর যত স্বাধীনচেতা নারী স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের একটি আদর্শ হতে পেরে আমি গর্বিত।’

    সারাহ মারকুইস তার ৩ বছরের ভ্রমণ শেষে একটি আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি একজন ভালো বক্তাও। তিনি মনে করেন প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই ভ্রমণের নেশা রয়েছে। এই নেশা লুকানো থাকে। মানুষ যখন সাগর, মরু, পাহাড় এবং প্রকৃতির কাছাকাছি যায় তখন সেই শক্তিশালী নেশা উকি দেয়। পুরোপুরি বিষয়ী মানুষও হয়ে পড়েন উদাসিন। মানুষের উচিৎ এই নেশা আরও বেশি করে অনুভব করা। এটা প্রকৃতির সাথে একাত্মতার নেশা। সারাহ বলেন, গোবি মরুভূমির মাঝখানে যখন একলা হেঁটেছি আমি, তখন এই একাত্মতাই ছিল আমার সঙ্গী।

    (Visited 33 times, 1 visits today)

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *