Templates by BIGtheme NET
Home / আরও / বিভীষণ সীমান্তের বিভীষণ বিজিবির কমান্ডার

বিভীষণ সীমান্তের বিভীষণ বিজিবির কমান্ডার

  • ২২-০২-২০১৬
  • 2016_02_22_23_46_17_z8reXEzxUGnYNdsH64uMydqdtd6Mgq_original

    নিজস্ব প্রতিবেদক ,চাঁপাইনবাবগঞ্জ: রামের আক্রমণে লংকার অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে ঠিক সেই জরুরি সময়ে রাজা রাবনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন তার আপন চাচা বিভীষণ। রাজ্য রক্ষায় সহযোগিতা না করে শত্রুর সঙ্গে আঁতাত করেন তিনি। গোমস্তাপুর উপজেলার বিভীষণ সীমান্তে এমনই এক গৃহশত্রুর উত্থান হয়েছে। সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবি কমান্ডার বাসেদ আলী রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় গরু আনতে বাধ্য করছেন ব্যবসায়ীদের।

    এই সীমান্তে অনুমোদিত বিটে রাখালদের নির্যাতন ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে গরু আনতে স্বয়ং বিজিবি উৎসাহ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

    গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাখালদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

    সরেজমিনে স্থানীয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সীমান্তে ভারতীয় গরু আনা এবং গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্তে গবাদীপশুর বিট চালু করেছে। ওইসব বিটের মাধ্যমে আনা প্রতিটি গরু বৈধকরণে কাস্টমসে ৫০০ টাকা ফি’র মাধ্যমে ব্যবসায়ীদেরকে করিডোরের ছাড়পত্র নিতে হয়। এরপর গরুগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।

    সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নে ৪৩ বিজিবির অধীনস্থ বিভীষণ বিওপি’র পার্শ্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত একটি বিট হচ্ছে মেসার্স দীপ্ত টেডার্স। এই প্রতিষ্ঠানটির মালিক আলমগীর ইসলাম।

    দীপ্ত ট্রেডার্সের মাধ্যমে গত ৯ নভেম্বর থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০ হাজার ৭৭৬টি গরু বাংলাদেশে আসে। এর ফলে রাজস্ব বাবদ ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হয়।

    কিন্তু বিভীষণ বিওপি’র কমান্ডার সুবেদার বাশেদ আলী গরু ব্যবসায়ীদের ভারত থেকে করিডোরের মাধ্যমে গরু না এনে বিজিবিকে গরু প্রতি ১৫০০ টাকা দিয়ে অবৈধ পথে গরু আনার জন্য চাপ সৃষ্টি করে।

    কিন্তু বিজিবির ওই ক্যাম্প কমান্ডারের কথামতো ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে গরু আনতে অস্বীকৃতি জানায়। এজন্য ক্ষুব্ধ হয়ে ওই ক্যাম্প কমান্ডার গত ৩ ফেব্রুয়ারি সরকারকে আইন মোতাবেক রাজস্ব দিয়ে আনা ৩৯টি গরু ও মহিষ মালিকবিহীন দেখিয়ে নিলামে বিক্রি করে দেয়।

    এই নিলামের মাধ্যমে গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর গ্রামের ব্যবসায়ী খাইরুল ইসলামের ১৮টি, ইসলাপুর গঞ্জের আনারুলের ১৪টি এবং জশৈল গ্রামের মোস্তাকিম হোসেনের ৭টিসহ মোট ৩৯টি গরু ও মহিষ বিক্রি করে দেন বিওপি কমান্ডার বাসেদ আলী। এর ফলে ঐসব ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।

    ক্ষতিগ্রস্ত ওই ৩ জন ব্যবসায়ী সরকারকে রাজস্ব দিয়ে আনা ও বেআইনিভাবে নিলামে বিক্রি করা ৩৯টি গরুর মালিক বা দাবিদার হিসেবে রহনপুর কাস্টমসে মামলা করেছে।

    এদিকে বিভীষণ সীমান্তে এত বিপুল পরিমান গরু নিলামের কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গরু ব্যবসায়ীরা এখন কমান্ডারের কথামতো গরু প্রতি ১৫০০ টাকা দিয়ে এবং সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে অবৈধভাবে প্রতিদিনই শত শত গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছে।

    অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি এই চারদিনে দীপ্ত ট্রেডার্সের মাধ্যমে সরকারকে যথানিয়মে রাজস্ব দিয়ে দেশে গরু এসেছে ১১৭৩টি। অপরদিকে দীপ্ত ট্রেডার্সকে কৌশলে সরিয়ে দিয়ে ওই বিজিবি কমান্ডার ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি এই ১৪ দিনে মোট ২২৮টি গরু দেশে আনার তথ্য সরকারি খাতায় উল্লেখ করেছেন। এই শুভঙ্করের ফাঁকিতে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অবৈধভাবে কোনো কাগজপত্র ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে গরু পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বৈধভাবে দীপ্ত ট্রেডার্সের মাধ্যমে গরু আনতে আগ্রহী।

    কিন্তু গরু ব্যবসায়ী, আব্দুল হাকিম, ফারুক আলম, আনারুল ইসলামসহ রাখালরা জানান, তারা গরু পরিবহনে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বৈধভাবে করিডোরের মাধ্যমে সরকারকে রাজস্ব দিয়ে গরু আনার চিন্তাভাবনা করলেও ওই বিজিবি কমান্ডারের নির্যাতনের ভয়ে তা করতে পারছে না।

    এদিকে বিজিবি কমান্ডার বাসেদ আলীর জোরপূর্বক গরু প্রতি ২ হাজার টাকা আদায়ে সহায়তা করছে স্থানীয় একটি দালাল চক্র।

    এমনকি যেসব রাখাল বিজিবির কথামতো টাকা দিয়ে গরু আনছে না তাদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যে আটক করে হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে চালান দেয়া হয়েছে। ভীতি প্রদর্শনের লক্ষ্যে এ ধরনের ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ড এখনও অব্যাহত আছে।

    ওইসব ভূক্তভোগীরা বলছেন, ওই সীমান্ত দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে ২৫০-৩৫০টি গরু দেশে প্রবেশ করে।

    এদিকে বিট মালিক আলমগীর ইসলাম ভারত থেকে আনা গরু বিটে প্রবেশ ও করিডোর নিশ্চিত এবং নিরাপত্তা চেয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা টাস্কফোর্সের সভাপতি বরাবর আবেদন করেছেন।

    তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু বরাবরই চলে আসছে। ভারতীয় রাখালরা জিরো পয়েন্টে গরু নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশি রাখাল ও ব্যবসায়ীরা বিজিবির সহায়তায় তা গ্রহণ করে এবং বিট ও করিডোরের মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে কেনাবেচার জন্য নেয়া হয়।

    কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিভীষণ বিওপি’র কোম্পানি কমান্ডার বাসেদ আলী কিছু বিট ও করিডোর করা গরু মালিকবিহীন দেখিয়ে নিলাম করায় ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। শুধু তা-ই নয় কমান্ডার নিজের পকেটস্থ করার জন্য গরু ব্যবসায়ীদের করিডোরবিহীন গরু আনতে উৎসাহিত ও চাপ সৃষ্টি করছে।

    এছাড়াও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বিভিন্নস্থানে কেনাবেচার জন্য বৈধ কাগজপত্র ছাড়া এসব করিডোর বিহীন গরু নিরাপদ নয়। যার কারণে তারা গরু আনতে সাহস পাচ্ছে না। আর এই সুযোগে বিজিবি ও স্থানীয় একটি দালাল চক্রকে ১৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা দিয়ে করিডোর বিহীন এসব গরু দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠাচ্ছে কিছু সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ী ও দালাল চক্র। ফলে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে প্রতিদিন।

    সমস্যাটির সমাধান চেয়ে গরু ব্যবসায়ীরা ৪৩ বিজিবির অধিনায়ককে জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার হয়নি।

    এদিকে, সরকারের রাজস্ব আয় ও গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, আব্দুল হাকিম, ফারুক আলম, আনারুল ইসলাম ও আলমসহ একাধিক গরু ব্যবসায়ী, রাখাল ও বিট মালিক।

    এ ব্যাপারে ৪৩ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহিদ হাসান বলেন, ভারত থেকে গরু আসা কমবেশি হবে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তারপরও গরু আসছে, আর করিডোরবিহীন গরু পাওয়া গেলে তার ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর করিডোরবিহীন গরু ছাড়ে বিজিবির কোনো সদস্যের শৈথিল্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

    (Visited 9 times, 1 visits today)

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *