Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / সাক্ষাৎকার / ধর্ষণ সহায়ক মানসিকতা

ধর্ষণ সহায়ক মানসিকতা

  • ১৮-০৫-২০১৭
  • Golam Mortoza (1)গোলাম মোর্তোজা :  দুইজন ছাত্রী নির্যাতিত হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে- সকল রকম প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তারা সামনে এসে সে কথা বলছে। একটা স্বাধীন দেশ, যে দেশের আইন আছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। তারা কী করছে? সমাজ কী করছে? কথা এবং কাজ দিয়ে পুনরায় নির্যাতন করছে। একটা অংশ আবার প্রশ্ন তুলছে ‘কেন গেল’। অনেকে গল্প শোনাচ্ছেন, আমাদের সময়ে সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরতে হতো…।

     সাধারণ জনমানুষ বিচারের দাবিতে বিক্ষুব্ধ। প্রগতিশীল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির দাবিদার অনেককে দেখা যাচ্ছে ‘কেন গেল’জাতীয় প্রশ্ন তুলতে। বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ মিনমিন করছে ‘সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’হচ্ছে। পুলিশের যা করার কথা তা করছে কি না, সে প্রশ্ন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘সবই ঠিক ছিল, শুধু ষড়যন্ত্রই সবকিছু নষ্ট করে দিল’- এই মনোভাব নিয়ে তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

    এ রকম অবস্থায় যা ঘটল, ঘটছে তার দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।

    ০১.
    ‘আমার ছেলে আকাম করছে তো কী হইছে। আমিও তো করি।’

    একজন লোক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, লাথি দিয়ে সব কিছুকে তছনছ করে দিচ্ছে। লোকটি ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত শাফাতের বাবা স্বর্ণ ব্যবসায়ী দিলদার আহমেদ। তার এই দাম্ভিকতার উৎস কী? সাবেক মন্ত্রী ও একজন রাজনৈতিক নেতা তার দাম্ভিকতার উৎস। ‘অর্থ’আর ‘ক্ষমতা মিলেমিশে দাম্ভিকতা। কিসের আইন, কিসের পুলিশ। এই লোকটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

    ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত একজন অপরাধীকে বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে! ‘উন্নয়ন’আর ‘আইনের শাসন’র গল্প চলছে সগৌরবে!!

    ০২.
    ‘আপনারা কি নর্তকী, হোটেলে কেন গেছেন, রাতে কেন গেছেন’- গুলশান থানার ওসির বক্তব্য। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা তিনি। আপনি এদেশের মানুষ, আপনার অর্থে এই পুলিশ কর্মকর্তার বেতন হয়। সেই পুলিশ কর্মকর্তা যখন এমন কথা বলে, জবাবদিহির আওতায় আনা হয় তাকে? বলা হচ্ছে, ‘তদন্ত হচ্ছে’। আস্থা রাখা যায়, পারেন আস্থা রাখতে?

    শাফাতের বাবা বললেন, তার ছেলে বাড়িতেই আছে। পুলিশ বলে ‘নেই’। একদিন পর অভিযান চালিয়ে পুলিশ বলল ‘পাওয়া যায়নি, শাফাতের বাবা মিথ্যা বলেছে’।

    পুলিশের এই বক্তব্য সত্য ধরে নিলে, শাফাতের বাবার কথায় পুলিশের ইমেজ ক্ষতি হয়েছে। পুলিশের ইমেজ যার কথায় ক্ষতি হলো, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো আইন পুলিশের হাতে নেই?

    ০৩.
    তদন্ত, ছায়া তদন্ত… গল্পের মাঝে দুই ধর্ষক পালিয়ে সিলেটে চলে গেল। সিলেটে কী করে গেল। পুলিশের দায়িত্ব ছিল না নজরদারিতে রাখার? ভালো যে সিলেট থেকে দুই জনকে গ্রেফতার করা গেছে। এই গ্রেফতার নিয়ে এতো কৃতিত্ব দাবি করার কিছু নেই। ইচ্ছে করলে ঢাকায় তাদের বাড়ি থেকেই গ্রেফতার করা যেত। তা না করে, সিলেট চলে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আইজিপি তৎপর না হলে হয়তো তারা পালিয়ে বিদেশেও চলে যেত।

    অন্য তিন আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।

    ০৪.
    যেখানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেই ‘রেইনট্রি হোটেল’ কর্তৃপক্ষ একেক সময় একেক রকমের কথা বলছে। যার পুরোটাই অপরাধীদের পক্ষে। মাদক নিয়ে রুমে না যাওয়া, অস্ত্র জমা দিয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি বলা- এই বক্তব্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়। এ বিষয়ক তদন্তে পুলিশের কোনো তৎপরতা নেই। বলা হচ্ছে ভিডিও ফুটেজ একমাসের বেশি সংরক্ষণ করা হয় না। মুছে ফেলা হয়েছে। এই বক্তব্য সত্যি ধরে নিলেও, পুলিশের অনেক কিছু করার আছে।

    আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অত্যাধুনিক ল্যাব আছে। দেশে সরকারের বাইরেও অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আছেন। তাদের অনেকের বক্তব্য, রেইনট্রি হোটেলের সার্ভার জব্দ করে মুছে ফেলা ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করা একেবারে অসম্ভব নয়। ছাত্রী দু’জন সকালে হোটেল থেকে ‘হাসতে হাসতে’বের হয়েছে।

    হোটেল কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য অত্যন্ত আপত্তিকর এবং বিশ্বাসযোগ্য নয়। সারারাত এত কিছু ঘটল, তার কিছুই তাদের মনে থাকল না। সকালে ‘হাসতে হাসতে’বের হলো, শুধু এটাই তাদের মনে থাকল? অভিযুক্ত ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষও নির্যাতিতদের এখনও নির্যাতন করে চলেছেন।

    ০৫.
    সব পুলিশ খারাপ না, পুলিশ শুধু খারাপ কাজই করে না। এসবের পক্ষে অনেক উদাহরণ তুলে ধরা যায়। তবে এসব কিছু গুরুত্বহীন হয়ে যায় মানুষের ধারণা জগতে এসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে ‘পাবলিক পারসেপশন’কী- তা কারোরই অজানা নয়। এই পারসেপশন দূর করার ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিতে দেখা যায় না।

    তনু-মিতু, সাগর-রুনী… মামলায় পাবলিক পারসেপশন স্থায়ী রূপ পেয়ে যায়। সেই স্থায়ী রূপের উপর চকচকে প্রলেপ লেগে যায় অনবরত। দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণের তদন্তের চেয়ে চাপা দেয়ার দিকে যখন মনোযোগী হতে দেখা যায়, ওসিরা যখন কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে ক্লাবে সদস্য হন এবং তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না, তখন ইমেজ হারানোর আর কিছু বাকি থাকে না।

    যার দুই কান কাটা সে যায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে। তার লজ্জা বা হারানোর কিছু থাকে না। যত হতাশাই প্রকাশ করি, যত সমালোচনাই করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া আমরা চলতে পারি না। কর্তা ব্যক্তিদের কাছে অনুরোধ করি, রাস্তার মাঝখান দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হাঁটানোর ব্যবস্থা করবেন না।

    মানুষ যেন মনে করতে বাধ্য না হন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানসিকতা ধর্ষণ সহায়ক।

    পুলিশ কর্তাদের বোঝার সময় এসেছে, শুধু রাজনীতিবিদদের উপর দায় চাপিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। আপনাদের যা করার আছে, তা অন্তত করুন। নিজেরা রাজনীতিবিদ হয়ে যাবেন না।

    গোলাম মোর্তোজা : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
    s.mortoza@gmail. com

    (Visited 9 times, 1 visits today)

    আরও সংবাদ

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *