Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / সাক্ষাৎকার / ধনীর ধর্ষণ, গরীবের দর্শন

ধনীর ধর্ষণ, গরীবের দর্শন

  • ২২-০৫-২০১৭
  • s a picসাহেদ আলমঃ  এই লেখা যখন লিখছি তখন, সাফাত আর নাঈম জেলে, সাফাতের বাবা আপন জুয়েলার্সের ৩০০ কেজি সোনা জব্দ, জুয়েলার্স সমিতি ধর্মঘটে, রেইনট্রির মালিক ঝুঁকিতে, এর বাইরে নাঈমের সাথে সেলফি আছে কার কার, সেটা নিয়ে ব্যাপক সরগরম আমাদের সামাজিক মাধ্যম, স্বভাবতই গরম গণমাধ্যম অর্থাৎ পত্র পত্রিকা, টিভি চ্যানেলগুলো। আর গরম আমাদের সুপারহিরো আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী, যে এতদিন পর এমন একটা ধর্ষণ মামলা পাওয়া গেল যেটার অপেক্ষায় ছিলেন হয়তো তারা এতদিন।

    কেউ কেউ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন গরুর রচনা নদীতে গিয়ে পৌঁছেছে। বিষয়টা অনেক স্পর্শকাতর এবং সামাজিক ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ সৃষ্টি করতে পারে, তাই শুরুতেই বনানীতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ এবং এর প্রেক্ষিতে যে সামাজিক আন্দোলন হয়েছে সেটার উজ্জ্বল দিকগুলো বলে নিতে চাই।

    এই ঘটনার দুটি দিক আছে। একটি সাফাত-নাঈম আর ধর্ষণ সংক্রান্ত আলোচনা অন্যটি আপন জুয়েলার্স, সোনা মজুদ, অবৈধ ব্যবসা, বনানী আবাসিক হোটেল সংস্কৃতি এবং পুলিশ-শুল্ক বিভাগের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা। সাফাত-নাঈম-ধর্ষণ আলোচনায় আমাদের সামাজিক আড়ষ্টতা অনেকখানি ভেঙ্গে গেছে বলেই বিশ্বাস করছি আমি। এটা বিশাল অর্জন একটি রক্ষণশীল সমাজের জন্য।

    আলোচনার সীমারেখা ভেঙ্গে দিয়েছে খোদ ধর্ষনের শিকার সাহসী মেয়েটিই। সে নাচতে নেমে ঘোমটা টেনে দেয়নি, একবার যখন পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে তখন খুলেই বলেছে, নিজে চলে এসেছে একেবারে প্রদীপের আলোর মুখে। কী সাহসী এই নারী রে বাবা! এর আগে এমনটি কি দেখেছে বাংলাদেশ? আমি মনে করতে পারছি না, বরং মনে করতে পারছি অজস্র ধর্ষিত নারীর মরদেহ’র ছবি।

    আমি মনে করতে পারছি তনুর ছবি। আমি মনে করতে পারছি সাম্প্রতিক ধর্ষণের বিচার না পেয়ে বাবা-কন্যার আত্মহত্যার ছবি। সেই ছবির বিপরীতে কি চমৎকার এক ফিরে আসার ছবিই না হাজির হয়েছে বনানীর সাফাত-নাঈমের আলোচনায়।

    আবারও বলছি, কেউ কেউ এই অস্বস্তির আলোচনায় নতুন প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসতে চাইছেন। তাদের প্রশ্ন মেয়ে দুজন কেন গেছে সেখানে? কেন বিবাহিত কিংবা ডিভোর্সধারী ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করতে গেছে এসব নানা বিষয়। আবার কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন, এক হাতে তালি বাজে না, নিশ্চয়ই মেয়েদের কোন দোষ ছিল, তাদের বেপরোয়া জীবনযাপন ইত্যাদি নিয়ে নানা রসের আলোচনা।

    কিন্তু মেয়ে দুটির বক্তব্যকে আমলে নিলেই আরো একটু অন্ধকার ধারনা আমাদের পরিস্কার হতে বাধ্য। একটা মেয়ের তরফে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ককে বাধা দিয়ে ‘না’ বলার অর্থ যে, ‘না’ সেটা বুঝতে হবে এই সমাজকে। এটাই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা উচিৎ। নিশ্চয়ই মেয়ে দুজনের চরিত্রহানি করার নানান চেষ্টা অব্যাহত থাকবে ভবিষ্যতে, এখনও যেটা আছে।

    তবে আমাদের আরো গরম আলোচনা হওয়া উচিৎ। কোন মেয়েকে বন্ধুত্বসুলভ সর্ম্পকের ফাঁদে ফেলে তাকে উপভোগ করার প্রচেষ্টায় একটা নারী যখন না বলে, সেটা না-ই হয়, সেটা বোঝাপোড়ার ভিত্তিতে দৈহিক সম্পর্ক হয় না।

    বলে রাখি, এটি অবশ্যই অস্বস্তির আলোচনা। এখনও ৮০ ভাগ মানুষ ভাবেন বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্ক বেআইনী। তারা বিশ্বাস করতে চান, যে বিবাহপূর্ব দৈহিক সম্পর্ক খারাপ এবং তাদের নিকট কোন ছেলে মেয়ে, বা স্বজন এটাতে জড়িত নন। অসম্ভব ভুল ধারণায় এখনও আবদ্ধ রয়েছে আমাদের সমাজ। আজ-কালকার ছেলে মেয়েদের অর্ধেকের বেশি কোন না কোন ভাবে দৈহিক সম্পর্কে জড়িত হন, সামাজিক ভীতি, ধর্মীয় ভীতিকে উপেক্ষা করেই।

    এটা প্রাকৃতিক এবং আবহমান কাল থেকেই প্রচলিত। যদি কোন পুরুষ আর নারী এই সত্য অস্বীকার করেন প্রকাশ্যে, তাহলে তার উচিৎ হবে শুভ্র, সাদা কাপড় পরে মানুষকে তাবিজ বিলানো। কেননা, তিনি কল্প যুগের ভিন্নরূপী এক বাসিন্দা এই সময়ের বাস্তবতায়।

    সাফাত-নাঈম আর বনানী রেইনট্রি সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের তুলনামূলক সচেতন এবং সামাজিক মাধ্যমে অভ্যস্ত পুরুষকুল যেমন ধাক্কা খেয়েছে এবং নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার সুযোগ পেয়েছে, তাতে নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে তারা মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে আরো বেশি সতর্ক হবেন। যেটা সুস্থ সমাজের জন্য জরুরী।

    অন্যদিকে, মেয়েদের মধ্যে যারা এমন ঘটনার স্বীকার তারা একটু সাহস পাবেন যেন, ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা চেপে রেখে, দুমড়ে মুচড়ে না মরে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্র খুঁজে পাবেন। তবে সে আলোচনায় যাচ্ছি না, বলছি এই লেখার শিরোনাম নিয়ে।

    মাসে এমন কতজন নারী ধর্ষণ বা শারীরিক লাঞ্চনার শিকার হন বাংলাদেশে? সঠিক পরিসংখ্যান কি আছে? আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যানের বাইরে ব্রাকের তথ্য বলছে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২ জন শিশু ধর্ষিত হন। ২০১৬ সালে এক বছরে এক হাজারের বেশি ধর্ষণের তথ্য আছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ৮ জানুয়ারীর এক প্রতিবেদনে।

    জার্মান ভিত্তিক বাংলা সংবাদ মাধ্যম দয়েতসে ভেলে (ডি ডব্লিউ) জুলাই এর ২৭ তারিখ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে প্রতিদিনই গড়ে চার-পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন৷ আর প্রতিমাসে দেড় থেকে দুই শতাধিক ধর্ষিতাকে চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা৷

    এই হিসাব হচ্ছে যারা ওসিসিতে চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের৷ এছাড়া দেশের অন্যান্য হাসপাতাল এবং চিকিৎসা কেন্দ্রে যারা চিকিৎসা নেন তাদের হিসাব নেই ওসিসি’র কাছে৷ চিকিৎসার বাইরে যারা থাকেন, ‘সামাজিক লজ্জায়’ যারা ঘটনা প্রকাশ করেন না তাদের হিসাব পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ ওসিসি’র মতে সাধারণত এর শিকার ১৮-১৯ বছর বয়সি মেয়েরা৷

    আর খোদ রাজধানী ঢাকার চিত্রটা কিছুটা হলেও পাওয়া যায় পুলিশের হিসাব থেকে৷ ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৫৫৪টি মামলা হয়েছে৷ এর মধ্যে রাস্তা থেকে অপহরণ করে গাড়ির মধ্যে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মামলা রয়েছে অন্তত ৫০ ভাগ৷’

    থাক আর বাড়ালাম না পরিসংখ্যানের খাতা। এই সাফাত-নাঈম কর্মকাণ্ডের সপ্তাহখানেক আগে গাজীপুরে এক কিশোরী কন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে আল্লাহর কাছে বিচার দিতে এই ধর্ষণের অবাধভূমি থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন বাবা আর কন্যা আত্মহত্যা করে। একজন বাবার কাছে তার সন্তান যখন ধর্ষণের  বর্ণনা করেন, আর সেই বাবা যখন তার বিচার চেয়ে না পান, তখন তার বেঁচে থাকাটাই মরার মত বেঁচে থাকাতে পরিণত হয়।

    গাজীপুরের সেই বাবার প্রতি শ্রদ্ধা যিনি জীবন্ত মৃত না থেকে আত্মহননকেই সেরা পথ মনে করেছেন। এই সমাজের চোখে খুঁটি পুতে দিয়ে গেছেন। সে কারণেই হয়তো পরের সপ্তাহে সাফাত-নাঈম আর বনানী হোটেল এত আলোচনায়। দীর্ঘ ২ সপ্তাহ ধরে গরম আলোচনা প্রতিবাদ আর নানান খোলা কথায় সমাজের উঁচু নিচু বিষয়গুলো একটু পারিবারিকভাবে ‘ডিফ্রাগমেন্ট’ করা গেছে। সেজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ।

    তবে এই আলোচনায় গল্পের গরু গাছে উঠেছে সেটা ভীতিকর। অনেক ভীতিকর এই কারণে যে, যেই সমাজে সন্তানের অপরাধে বাবার বিচার হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত অন্ধকার হয়, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ আর পুলিশ ধর্ষণের বিচারের চাইতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার দিকে নজর দেন, সেটা একটা দীর্ঘমেয়াদী ভয় ঢুকিয়ে দেয়ার নামান্তর।

    সন্তানের অপরাধে বাবার বা পরিবারের ক্ষতি হতে দেয়াটা একটা অসভ্য সমাজের প্রতিচ্ছবির কথাই বলে। বাবার যদি অবৈধ ব্যবসা থেকে থাকে সেটা ভিন্ন তদন্তের বিষয়। রাষ্ট্রের নিয়মিত আইন বিভাগের সেটা তদারকি করাই ভালো। সেটা না হয়ে এখানে এক সন্তানের অপরাধে তার এতদিনের ব্যবসায়িক উদ্যোগকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার কাজে হাত দিয়েছে রাষ্ট্র।

    কেননা, এখানে আভিজাত্য আছে। এখানে টাকার লেনদেন এর গল্প আছে। এখানে বনানীর মতো জায়গা আছে। এখানে রেইনট্রি হোটেলের মত আরো শ’খানেক হোটেলকে শায়েস্তা করার উপকরণ আছে। এখানে আপন জুয়েলার্স এর স্বর্ণের মত আরো বস্তা বস্তা স্বর্ণের হাতছানি আছে। এখানে নারীকে নিয়ে গল্পের ফাঁদ পাতার রসদ আছে। এই সবই ধনাঢ্য সমাজের উপকরণ। সেখানে একজন নারীর ধর্ষণকে নানা উপকরণে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করতে কেউই সময় নেননি।

    কিন্তু এই রাষ্ট্রের, এই সমাজের, এই সামাজিক মাধ্যম, এই গণমাধ্যমের, এই পুলিশ বাহিনীর, এই শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের কোন দায় নেই, প্রতিদিন যে ২ জন শিশু ধর্ষিত হয় তার জন্য। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) সারা দেশ থেকে প্রতিদিনই গড়ে চার-পাঁচজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন-তাদের জন্যেও কোন দায় নেই।

    দায় নেই, গাজীপুরের ঐ গরীব পিতার জন্য, বা তার মত হাজারও গরীব পিতা-মাতার জন্য। ওগুলো শুধুই ‘দর্শন’ চেয়ে চেয়ে দেখে যাওয়ার বিষয়? ধনীর ধর্ষণ, গরিরের ক্ষেত্রেও ধর্ষণ বিবেচিত হতে আর কত দেরী? এই রাষ্ট্র কি তনুর ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার বিচার করেছে?

    ১৯ মে ২০১৭ নিউইয়র্ক, আমেরিকা।

    সাহেদ আলম : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
    shahedalam1@gmail.com

    (Visited 22 times, 1 visits today)

    আরও সংবাদ

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *