Templates by BIGtheme NET
শিরোনামঃ
Home / জাতীয় / জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান

জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান

  • ০৩-০৭-২০১৬
  • jkkkjlkl

    রাজধানীর গুলশানে জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান হয়েছে। শনিবার সকালে যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে। এর আগে শুক্রবার রাতে রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান নামে এক অভিজাত রেস্টুরেন্টে ঢুকে ১৭ জন বিদেশীসহ ২০ জনকে জবাই করে জঙ্গিরা। এদের মধ্যে নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়, দু’জন বাংলাদেশী এবং একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান রয়েছেন। এদিন ওই রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে জঙ্গিদের হাতে তারা জিম্মি হয়েছিলেন।
    ওই ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই জঙ্গিদের এলোপাতাড়ি গুলি ও বোমার আঘাতে নিহত হন ২ পুলিশ কর্মকর্তা। আহত হন আরও অন্তত ৩০ পুলিশ সদস্যসহ ৫০ জন। তাদের মধ্যে তিন পুলিশ কর্মকর্তার অবস্থা আশংকাজনক বলে জানা গেছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কাউকে জিম্মি করে এ জঙ্গি হামলায় মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি জিম্মিদের উদ্ধারে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামের কমান্ডো অভিযানে ছয় জঙ্গি নিহত হয়। আর রেস্টুরেন্ট থেকে ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একজন জাপানি ও ২ জন শ্রীলঙ্কান নাগরিক রয়েছেন। সেনা, নৌ, র‌্যাব ও পুলিশের বিশেষায়িত টিম সোয়াতের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের পর শনিবার বিকালে রেস্টুরেন্ট থেকে একে একে লাশ বের করে অ্যাম্বুলেন্সযোগে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১০টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহত সবার বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে জীবিত অবস্থায় যাদের উদ্ধার করা হয়েছে তারাও গোয়েন্দা হেফাজতে ছিলেন।
    এদিকে লোমহর্ষক এ ঘটনার খবর মুহূর্তের মধ্যে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মিডিয়া এ ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করে। তবে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে এক পর্যায়ে দেশী টেলিভিশনগুলো সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। জঙ্গি হামলার ঘটনা জানার পর নির্ঘুম রাত কাটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও দেশবাসীর। তারা প্রতি মুহূর্তের খবর জানতে টেলিভিশন খুলে বসে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাতভর জেগে থেকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। সেহরির পর তিন বাহিনীর প্রধান গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নেন বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
    অন্যদিকে বংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস এ জঙ্গি হামলায় উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রতিবেশী ভারতসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ফোন করে তাদের উদ্বেগের কথা জানান। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে নিহতদের স্মরণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন।
    শনিবার বিকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে জানাজা শেষে ওসি সালাউদ্দিন খানের লাশ বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। আর সহকারী কমিশনার রবিউল করীমের লাশ তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তার লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা।
    এদিকে জানাজা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, গুলশানে হামলার ঘটনাটি চলমান জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের একটি অংশ। অন্যদিকে আইজিপি একেএম শহীদুল হক বলেন, হামলায় নিহত ৬ জনের ৫ জন পুলিশের তালিকাভুক্ত জঙ্গি। দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ তাদের খুঁজছিল বলে তিনি দাবি করেন। তবে তাদের নাম-পরিচয় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি।
    শুক্রবার রাতে ওই রেস্টুরেন্টে হামলার পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সংকট নিরসনে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। প্রথম দফায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর থেকেই ক্ষণে ক্ষণে নির্দেশনা আসে শীর্ষ পর্যায় থেকে। দ্বিতীয় দফায় ভোরে শীর্ষ পর্যায় থেকে র‌্যাব ও পুলিশের বিশেষায়িত টিম সোয়াতকে দিয়ে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেও সে অবস্থান থেকে সরে আসা হয়। সর্বশেষ জিম্মিদশা থেকে উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা আসে। ওই নির্দেশনার পর ভোরে গুলশানের ঘটনাস্থলে ছুটে আসে নৌ কমান্ডোর একটি দল। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই সিলেট থেকে বিশেষ বিমানে করে ঢাকায় আসেন সেনা কমান্ডোর একটি দল। ঘটনাস্থলে আসে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়াযান।
    প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে একদল জঙ্গি-সন্ত্রাসী গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ ক্যাফে হলি আর্টিজানে গুলি ছুড়তে ছুড়তে প্রবেশ করে। ‘আল্লাহু আকবর’ বলে বন্দুকধারী এসব সন্ত্রাসী রেস্টুরেন্টে প্রবেশের পর সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। এলোপাতাড়ি গুলির শব্দে এ সময় সেখানে সৃষ্টি হয় এক ভয়ার্ত পরিবেশের। ঘটনার সময় একটি ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে গুলশান এলাকায় অবস্থান করছিলেন মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাদের সঙ্গে বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন খান এবং গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করীমও ছিলেন। খবর পেয়ে তারা দ্রুত ৭৯ নম্বর রোডের ওই রেস্টুরেন্টে ছুটে যান। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে গিয়ে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা জঙ্গি হামলার শিকার হন। ওই সময় রেস্টুরেন্টের ভেতরে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। বিস্ফোরণ ও গুলিতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন পুলিশের দুই কর্মকর্তা (এসি রবিউল ও ওসি সালাউদ্দিন)। পরবর্তীতে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাদেরকে মৃত ঘোষনা করেন। ঘটনার সময় প্রায় আধা ঘণ্টা থেমে থেমে গুলি ছোড়ে জঙ্গিরা। এতে পুলিশের ৩০ সদস্যসহ অন্তত ৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তি আহত হন।
    এ ঘটনার পর রাত দেড়টার দিকে জঙ্গিদের অনলাইনভিত্তিক কর্মকাণ্ড তদারককারী মার্কিন ওয়েবসাইট সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপ এক টুইট বার্তায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করে। জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সংবাদমাধ্যম আমাকের উদ্ধৃতি দিয়ে অনলাইনটি জানায়, আইএস যোদ্ধারা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়েছে। ওই টুইট বার্তায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে ২০ বিদেশীকে হত্যার দাবি করে।
    এরপর ভোর ৪টার দিকে পুলিশের বিশেষায়িত টিম সোয়াত জঙ্গি আক্রান্ত ওই রেস্টুরেন্ট থেকে এক বিদেশী নাগরিকসহ দু’জনকে জীবিত উদ্ধার করে। ওই দু’জন রেস্টুরেন্টের বাইরে সীমান্ত প্রাচীরের ভেতরে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়েছিলেন। সোয়াত টিমের সদস্যরা বুলেটপ্রুফ ঢাল নিয়ে খুব কাছাকাছি গিয়ে ওই দু’জনকে ছোঁ মেরে নিয়ে আসে। এভাবেই কাটে শুক্রবার পুরো রাত। ততক্ষণে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সেনা, নৌ, বিমান, র‌্যাবের সমন্বিত যৌথ বাহিনী। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে জিম্মিদের উদ্ধারে যৌথ কমান্ডো অভিযান শুরু হয়। এতে তারা সময় নেয় মাত্র ৪৫ মিনিট। এ সময় গুলি ছুড়তে ছুড়তে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়াযান রেস্টুরেন্টটির সীমানা প্রাচীর ভেঙে ভেতরে ঢুকে যায়। গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যায় রেস্টুরেন্টের দেয়াল। বেলা ১১টার দিকে যৌথ কমান্ডো অভিযান শেষ হয়।
    পরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) পরিচালক কর্নেল রাশিদুল হাসান জানান, অভিযান শেষ হয়েছে। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। আইএসপিআরের পক্ষ থেকে মাত্র ১৩ মিনিটের অভিযান শেষে সকাল সোয়া আটটার দিকে কমান্ডোরা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় বলে জানানো হয়। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকে হামলাকারীদের ব্যবহৃত চারটি পিস্তল, একটি ফোল্ডেড বার একে-২২ পিস্তল, চারটি আইইডি, একটি ওয়াকিটকি সেট এবং বেশকিছু ধারালো দেশীয় অস্ত্র (রামদা জাতীয়) উদ্ধার করা হয়। অভিযান শেষে কমান্ডোরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন থেকে শুরু হয় ঘটনাস্থলে বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহের কাজ।
    ২৬ লাশ সিএমএইচে : অভিযান শেষে শনিবার বিকালে ১৩টি অ্যাম্বুলেন্সে করে ২৬টি লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। কড়া প্রহরার মধ্য দিয়ে এসব লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। শুক্রবারের ওই জঙ্গি হামলা ও অভিযানে মোট ২৮ জন নিহত হয়েছেন।
    স্থানীয় সূত্র জানায়, হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশী নাগরিক। তারা হলেন- ফারাজ হোসেন, ইশরাত আকন্দ ও অবিন্তা কবির। এছাড়া ভারতীয় নাগরিক তারুশী জৈনের নামও জানা গেছে। তারিশা জৈনের নিহতের খবর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এক টুইটবার্তায় বলেন, ‘ঢাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি ভারতের তরুণী তারুশী নিহত হয়েছেন। তার বাবার নাম জিয়ান সঞ্জীব।’
    আরও জানা গেছে, নিহত বাংলাদেশীদের মধ্যে ফারাজ শিল্পপতি লতিফুর রহমানের নাতি। তার মেয়ে সিমিন হোসেনের দুই ছেলের মধ্যে ফারাজ সবার ছোট। ফারাজ ট্রান্সকম গ্রুপে শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করছিল। শুক্রবার রাতে নিজে গাড়ি চালিয়ে গুলশানের ওই ক্যাফেতে গিয়েছিল ফারাজ। ইশরাত আকন্দ আফতাব গ্রুপের মালিকের মেয়ে এবং ঢাকার একটি আর্ট গ্যালারির সাবেক প্রধান। অবিন্তা কবীর ফিতান এলিগ্যান্ট গার্মেন্ট মালিকের মেয়ে। ডেএক্সওয়াই ইন্টারন্যাশনালের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক ইশরাত ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান ক্রিয়েটিভসে ছিলেন। তিনি গ্রামীণফোন ও ওয়েস্টিন হোটেলেও কাজ করেছেন।
    এদিকে ইতালি দূতাবাসের কর্মকর্তারা দাবি করেন, এ ঘটনায় নয়জন ইতালীয় নাগরিক নিখোঁজ আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিন চ্যান জো, নাদিয়া বেন ডেপ্তি, আদি, মারাকা, মারিয়া ও সিমনি। তারা সবাই স্টুডিও টেক্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (এডমিন) ফারুক আলম খতিব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইতালীয় নাগরিকরা শুক্রবার রাতে ওই রেস্তোরাঁয় খেতে যান। যে দুটি গাড়িতে করে রেস্তোরাঁয় গিয়েছেন সেই দুই গাড়ির চালক শরিফ ও ভিনছং জানান, গোলাগুলি শুরু হলে তারা পালিয়ে আসেন। এছাড়া জাপানি সাত নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। জাপান সরকারের মুখপাত্র চোইচি হাগিউদা বলেন, রেস্তোরাঁয় ৮ জন জাপানি ছিলেন। যারা জাইকার একটি প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৭ জন নিখোঁজ আছেন।

    (Visited 1 times, 1 visits today)

    আরও সংবাদ

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    *